ArticleIDPicAddressSubjectDate
{ArticleID}
{Header}
{Subject}

{Comment}

 {StringDate}
 
 
 
 
 
 
 
ViewArticlePage
 
 
 
  • নূরনবী মোস্তফা (সাঃ) ( ৪১তম পর্ব)  
  • Sendtofriend
  •  
  •  
  • নূরনবী মোস্তফা (সাঃ) ( ৪১তম পর্ব) ইসলামের শত্রুরা কেবল অন্ধ একগুয়েমী ও হিংসার কারণেই সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) ও তাঁর প্রচারিত পবিত্র ইসলাম ধর্মের অবমাননা করছে৷ পাশ্চাত্যের তরফ থেকে ইসলাম ও বিশ্বনবী (সাঃ)'র এতো অবমাননা এবং এ ধর্মের বিস্তার প্রতিরোধের জন্যে এতো অপপ্রচার ও ষড়যন্ত্র সত্ত্বেও মানবজাতির সর্বোত্তম কল্যাণের দিশারী বিশ্বনবী (সাঃ)'র প্রতি জনগণের সম্মান কমেনি বরং তা বেড়েই চলেছে৷ একইসাথে ইসলামের প্রতি জনগণের আকর্ষণও বৃদ্ধি পাচেছ৷ অন্যকথায় বিশ্বনবী (সাঃ)'র পুত-পবিত্র চরিত্র এবং তাঁর অসাধারণ মহতী গুণাবলীকে কালিমালিপ্ত করার জন্যে আধুনিক যুগের আবু জাহেল ও আবু লাহাবদের ষড়যন্ত্রগুলো অতীতের মতোই ব্যর্থ হয়েছে৷ যেসব লোক অপরিচছন্ন ও সংকীর্ণ চিন্তাধারায় অভ্যস্ত এবং নৈতিকতা ও যুক্তির ধার ধারে না, তারা সাধারণতঃ অন্যদেরকেও বিশেষ করে মহাপুরুষকেও নিজের মতোই খারাপ, যুক্তি-বিরোধী ও অপবিত্র মনে করে৷ ইরানী প্রবাদবাক্যে বলা হয় একজন অবিশ্বাসী বা কাফের অন্যদেরও কাফের মনে করে৷ অন্যদিকে যারা সত্যসন্ধানী, যুক্তিবাদী ও চিন্তাশীল তারা মানব জাতির পথ প্রদর্শক ও মহান ব্যক্তিদের শ্রদ্ধা করে থাকেন৷ প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের অনেক অমুসলিম লেখক, গবেষক, মনিষী ও চিন্তাবিদ বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ)'র ব্যক্তিত্ব ও চরিত্র সম্পর্কে নিরপেক্ষ বিচার-বিশ্লেষণ করতে গিয়ে প্রকৃত বা বস্তুনিষ্ঠ এবং বিদ্বেষমুক্ত মতামত তুলে ধরেছেন৷ গত অনুষ্ঠানে আমরা এ ধরনের কয়েকজন খ্যাতনামা ব্যক্তিত্বের মতামত তুলে ধরেছি৷ আজও আমরা বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ)'র নূরাণী ও তুলনাহীন ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে ধরনের আরো কয়েকজন খ্যাতনামা অমুসলিম ব্যক্তিত্বের মতামত তুলে ধরবো৷ পাশ্চাত্যের বিখ্যাত ঐতিহাসিক আর. এফ. বুডলি মুহাম্মাদ (সাঃ)'র জীবনী শীর্ষক বইয়ে মহান আল্লাহর সর্বশেষ রাসূল (সাঃ) সম্পর্কে মিথ্যা অভিযোগ ও অপবাদের নিন্দা করে লিখেছেন, মুহাম্মাদের জীবনী সংক্রান্ত একটি বই পড়েছি৷ এ বইয়ের লেখক যে কখনও বৃটেনের বাইরে পা রাখেন নি তা খুবই স্পষ্ট৷ কারণ, তিনি শুধু গীর্যাকে রক্ষার জন্যেই লিখেছেন৷ তিনি তার তিনশ পৃষ্ঠার বইটিকে অন্যায্য কথা দিয়ে কলংকিত করেছেন৷ এ লেখক তার বইটিতে মুহাম্মাদের নাম নিতে গিয়ে দজ্জাল শব্দটি ছাড়া অন্য কিছু ব্যবহার করেন নি৷ অথচ লেখক এ বিষয়েরও কোন ব্যাখ্যা দেন নি যে এরকম একজন ব্যক্তি কী করে মানবজাতির অগ্রগতির জন্যে এত উন্নত ও সমৃদ্ধ বিধান দিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছেন? তিনি কিভাবে এমনসব মানুষকে গড়ে তুলেছেন যারা অত্যন্ত কম সময়ের মধ্যে এক বিশাল ও উন্নত সভ্যতার গোড়াপত্তন করতে এবং প্রথম দিকেই বড় বড় জাতিগুলোকে নিজেদের সাথে যুক্ত করতে সক্ষম হয়েছেন? মিস্টার বুডলি আরো লিখেছেন, মরূচারী এবং বেপরোয়া জীবনে অভ্যস্ত দূর্দান্ত আরবদের অনুগত করতে পারাটা মুহাম্মাদের অন্যতম বিস্ময়কর সাফল্য৷ এ বিষয়টিকে তার সবচেয়ে বড় মো'জেজা বা অলৌকিক ঘটনাগুলোর সমতুল্য বলা যায়৷ তিনি সব আরব গোত্রকে বিস্ময়কর সূত্রে ঐক্যবদ্ধ করেন৷ মুহাম্মদের জীবনী নিয়ে চিন্তা করলে চিন্তাশীল ব্যক্তি মাত্রই তাঁর প্রজ্ঞা ও বিচক্ষণতার ব্যাপারে বিস্ময়ে হতবাক হতে বাধ্য এবং তারা মুহাম্মাদকে এক চিরঞ্জীব ব্যক্তিত্ব হিসেবে দেখতে পান৷ বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) সম্পর্কে বৃটেনের চিন্তাবিদ টমাস কার্লাইল বলেছেন, বর্তমান যুগের একটা বড় ত্রুটি হলো এ যুগের সুসভ্য মানুষ এমন কিছু লোকের কথা শুনছে যারা মনে করেন ইসলাম মিথ্যা ধর্ম এবং মুহাম্মাদ (সাঃ) একজন প্রতারক! এ ধরনের ভিত্তিহীন ও লজ্জাজনক বক্তব্যের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করার সময় এসেছে৷ কারণ যে ধর্ম-বিধান ও মিশন মুহাম্মাদ (সাঃ) এনেছেন তা শত শত বছর ধরে এক উজ্জ্বল আলোকবর্তিকার মতো আলো ছড়িয়ে দিচেছ৷ ভ্রাতৃবৃন্দ! আপনারা কি কখনও এমন কাউকে দেখেছেন যে একজন মিথ্যাবাদী ব্যক্তি একটি নতুন ধর্ম প্রনয়ন করতে এবং একই সাথে ঐ ধর্মকে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে? প্রভুর শপথ, এ ধরনের অপবাদ খুবই অদ্ভুত বা বিস্ময়কর! কারণ একজন অজ্ঞ ব্যক্তি একটি ঘর নির্মাণেরও ক্ষমতা রাখে না, অথচ এমন অজ্ঞ ব্যক্তি ইসলামের মতো এক ধর্মকে মানব সমাজে কিভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হলেন? কার্লাইল আরো লিখেছেন, এটা খুবই বড় ধরনের সমস্যা ও দুঃখ যে বিশ্বের জাতিগুলো যুক্তি ও প্রজ্ঞা ছাড়াই এ ধরনের অপবাদ মেনে নিচেছ৷ আমি বলবো এটা অসম্ভব যে এই মহান ব্যক্তি তথা হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) বাস্তবতা বা সত্য-বিরোধী কথা বলেছেন৷ তাঁর জীবন-ইতিহাসে দেখা যায় তিনি যৌবনকাল থেকেই জ্ঞানী ও চিন্তাশীল ছিলেন৷ রাসূলে পাক (সাঃ)'র সমগ্র জীবন ও সুন্দর গুণাবলীসহ তাঁর সমস্ত তৎপরতা ছিল সত্য ও পবিত্রতা ভিত্তিক৷ আপনারা তাঁর বাণীর দিকে লক্ষ্য করুন- তাঁকে কবি বা নবী যা-ই মনে করুন- তাঁর বাণীকে কি অনুপ্রেরণা ও খোদায়ী প্রত্যাদেশ মনে হয় না? এই মহান ব্যক্তি অস্তিত্বের অসীম উৎসের বার্তাবাহক বা রাসূল যিনি মানুষের জন্যে বার্তা বয়ে এনেছেন৷ বিধাতাই এই মহাপুরুষকে জ্ঞান ও প্রজ্ঞা শিখিয়েছেন৷" অমুসলিম চিন্তাবিদ বা মনীষীরা বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) সম্পর্কে এটি উল্লেখ করেছেন যে মূলতঃ অসাধারণ ব্যক্তিত্ব এবং উন্নত ধর্মের কারণেই রাসূলে পাক (সাঃ)'র নাম বিশ্বে অমরত্ব বা স্থায়ীত্ব লাভ করেছে৷ পবিত্র কোরআন ও এর প্রাণসঞ্জীবক শিক্ষা বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ)'র জীবন ও আত্মার মর্মমূলে প্রবেশ করেছিল এবং তিনি ছিলেন আদর্শ ও সর্বোত্তম মানুষের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত৷ রাসূলে পাক (সাঃ) তাঁর বিচক্ষণ দৃষ্টির মাধ্যমে এ বিশ্ব জগতের বাহ্যিক পর্দা বা আবরণের আস্তর ভেদ করে বাস্তবতাকে উপলব্ধি করতে পারতেন৷ তিনি ছিলেন বুদ্ধিবৃত্তিক পরিপূর্ণতা ও সচেতনতার অধিকারী৷ তাঁর চিন্তাভাবনা ছিল পুরোপুরি যথাযথ এবং তিনি মানবজাতির মুক্তির জন্যে সবচেয়ে ভালো কর্মসূচী উপহার দিয়েছেন৷ তাঁর অনুসারীরা ছিল নিষ্ঠাবান ও পবিত্র৷ পবিত্র অন্তর ও আলোকিত চেহারা নিয়ে তারা রাসূলে পাক (সাঃ)'র পাশে বসবাস করতেন৷ আসলে বুদ্ধিবৃত্তি বা বিবেকের সাথে ইসলামের সঙ্গতি থাকাতেই এই মহান ধর্মের আধ্যাত্মিক ও বস্তুগত কল্যাণ মানুষকে প্রভাবিত করেছে৷ বিখ্যাত ইংরেজ চিন্তাবিদ জন ডেভেনপোর্ট বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) সম্পর্কে তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ An apology for Muhammad And Quraan,বা মুহাম্মাদ (সাঃ) ও কোরআনের কাছে ক্ষমা শীর্ষক বইয়ে লিখেছেন, যারা ইসলামের নবী (সাঃ) সম্পর্কে সন্দেহ সৃষ্টির চেষ্টা করছে তাদের জেনে রাখা উচিত বৃহৎ লক্ষ্য অর্জনের জন্যে তাঁর অধ্যাবসায় ও দৃঢ়তা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়৷ আর এ বিষয়টিকে তিনি তাঁর জীবনের লক্ষ্যবস্তুতে বা টার্গেটে পরিণত করেছিলেন এবং তা বাস্তবায়নে অসাধারণ জোর দিতেন৷ আর এ কারণে সবাই তাঁর প্রশংসা করতে বাধ্য হন৷ এছাড়াও যারা মনে করেন, ইসলামের নবী (সাঃ) তরবারীর মাধ্যমে তাঁর ধর্ম ছড়িয়ে দিয়েছেন, তারা মারাত্মক ভুল করছেন৷ কারণ সকল পর্যবেক্ষক ও চিন্তাবিদ অত্যন্ত স্পষ্ট ও নিরপেক্ষভাবে এ সত্যের স্বীকৃতি দিয়েছেন যে মুহাম্মাদ (সাঃ) রক্তপাত বা সহিংসতার অবসান ঘটিয়েছিলেন৷ তিনি মানুষকে দেব-দেবী বা মূর্তির জন্যে হত্যার বা উৎসর্গ করার প্রথা বাতিল করে মানব জাতির জন্যে নামাজ ও যাকাতের প্রথা চালু করেছেন এবং তাঁর ধর্ম স্থায়ী যুদ্ধ ও সংঘাতের পরিবর্তে মানুষের আত্মায় সঞ্চারিত করেছে কল্যাণকামীতা, মানবপ্রেম ও সামাজিক গুণাবলীর চেতনা৷ জন ডেভেনপোর্ট তার বইয়ের একটি অধ্যায়ে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ)'র ওপর আরোপিত অপবাদগুলোর জবাব দিয়েছেন৷ তিনি এক জায়গায় লিখেছেন, হিজাজ বা গোটা আরব ভূখন্ড মূর্তি পূজার মতো ক‚প্রথায় নিমজ্জিত ছিল৷ মুহাম্মাদ (সাঃ) এই ভূখন্ডে আমূল ও স্থায়ী সংস্কার সাধনের মতো অসাধ্য সাধন করেন৷ তিনি শিশুদের হত্যা করা ও কণ্যা শিশুদের জীবন্ত কবর দেয়াকে নিকৃষ্ট ও অপছন্দনীয় বলে মনে করতেন এবং মদপান ও জুয়া খেলাকে নিষিদ্ধ করেন৷ আর এ ধরনের ব্যক্তিত্বের রেসালাত কি তার নিজের আবিষকৃত হতে পারে? মুহাম্মাদ (সাঃ) কখনও দুনিয়ার ক্ষমতা ও দুনিয়াবী শান-শওকতের প্রত্যাশী ছিলেন না৷ তিনি মানুষকে ন্যায়সঙ্গত আচার-আচরণ করতে বলতেন৷ তিনি মানবিকতা, দয়া ও উদারতার প্রেমিক ছিলেন৷ নিঃসন্দেহে পৃথিবী মুহাম্মাদের (সাঃ) মতো পবিত্রতম ও দূর্লভ ব্যক্তিত্ব আর সৃষ্টি করতে পারে নি৷ তাঁকে পৃথিবীর সবচেয়ে মহত ও অতুলনীয় মহান ব্যক্তিত্ব বলে মেনে নেয়া উচিত এবং পৃথিবী তাঁর এই মহত্তম সন্তানকে নিয়ে সব সময়ই গর্ব করতে পারে৷ শ্রোতা ভাই-বোনেরা আমরাও বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ)'র শানে মহান আল্লাহর পর সবচেয়ে সুন্দর ও সবচেয়ে উপযোগী প্রশংসা নিবেদন করে আজকের এই আলোচনা শেষ করছি এবং সত্যের পথে চলার ব্যাপারে রাসূলে পাক (সাঃ)'র মদদ বা সাহায্য কামনা করছি৷ নূরনবী মোস্তফা (সাঃ) ( ৪২তম পর্ব) ইসলাম ধর্মের আহবান জানাতে গিয়ে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) ও তাঁর সঙ্গী-সাথীগণকে ঠাট্রা-বিদ্রুপ থেকে শুরু করে অশেষ লাঞ্ছনা, নির্যাতন এবং এমনকি শাহাদতের মতো সর্বোচচ ত্যাগও স্বীকার করতে হয়েছে৷ আসলে ন্যায়বিচার, সাম্য, সত্য ও মুক্তির আহবান শোষক, নির্যাতক ও মানুষের ওপর প্রভুত্বের দাবীদার কায়েমী স্বার্থবাদীদের জন্যে সবচেয়ে বিপজ্জনক বলে বিবেচিত হত৷ তাই তাঁরা সত্যের আহবান প্রতিরোধের জন্যে সর্বশক্তি প্রয়োগ করবে-এটাই স্বাভাবিক৷ নূরনবী মোস্তফা (সাঃ) ও তাঁর সঙ্গী-সাথীরা যদি সত্যের আহবান জানাতে গিয়ে এত ব্যাপক বা অস্বাভাবিক নির্যাতন ও প্রতিরোধের শিকার না হতেন তাহলে সেটাই হতো অস্বাভাবিক ও বিস্ময়ের ব্যাপার৷ সত্যের আহবান যত সুদৃপ্ত ও যত খাঁটি হয়ে থাকে মিথ্যার বা বাতিলের প্রতিরোধ এবং নির্যাতনও তত কঠোর বা নির্মম হয়ে থাকে৷ সত্যের পথকে চেনার ও বোঝার এটাও অন্যতম পন্থা৷ তবে সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপার হলো সত্যের আহবান জানাতে গিয়ে তিলে তিলে অসহ যন্ত্রণা, নির্যাতন এবং সঙ্গী-সাথী বা পরিবারের ঘনিষ্ঠ সহযোগীর শাহাদতের মতো দূঃসহ পরিস্থিতির মধ্যেও দয়ার অতলান্ত সাগর বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) বিভ্রান্ত ও বিরুদ্ধবাদী জনতাকে অভিশাপ দেননি৷ বরং তিনি মহান আল্লাহর দরবারে তাদের জন্যে দোয়ার হাত প্রসারিত করে আল্লাহর দরবারে এ প্রার্থনা জানাতেন যে, হে আল্লাহ, এরা বোঝে না, তুমি তাদের সুপথ দেখাও বা বোঝার তৌফিক দান কর৷ তায়েফে ইসলামের আহবান জানাতে গিয়ে পাথর বৃষ্টির শিকার হবার পরও চরম ধৈর্য ধারণ করেছিলেন আল্লাহর সর্বশেষ রাসূল৷ তাঁর ওপর নির্যাতন এত চরমে উঠেছিল যে ফেরেশতারা পর্যন্ত বলতে বাধ্য হয়েছিল, হে আল্লাহর সর্বশেষ রাসূল! আপনি যদি আদেশ করেন তাহলে এ অবাধ্য জনগণের ওপর পাহাড় চাপিয়ে দিয়ে তাদের ধবংস করে দেব৷ কিন্তু দয়ার অতলান্ত সাগর নূরনবী মোস্তফা (সাঃ) তাদের অভিশাপ না দিয়ে তাদের মঙ্গল কামনা করেছিলেন৷ তিনি বলেছিলেন, এরা মুসলমান না হলেও এদের সন্তানরা হয়তো একদিন মুসলমান হবে৷ রাসূলে পাক (সাঃ) জানতেন আল্লাহর ধর্ম এক সময় বিজয়ী হবেই৷ যে মক্কার লোকেরা তাঁর ওপর এত নৃশংস নির্যাতন চালিয়েছিল মক্কা বিজয়ের সময় তিনি তাদের সবাইকে ক্ষমা করে দিয়েছিলেন৷ আর এই ক্ষমাশীলতা ও মহানুভবতা দেখে দলে দলে মক্কার কাফের ও মুশরিকরা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে৷ তাই এটা স্পষ্ট তরবারীর মাধ্যমে নয়, বরং পবিত্র কোরআনের বাণী ও বিশ্বনবী (সাঃ)'র অবিশ্বাস্য মহানুভবতা, বিস্ময়কর সততা, অশেষ খোদাভীরুতা, অভূতপূর্ব চারিত্রিক সৌন্দর্য ও অনুপম আচার-আচরণে আকৃষ্ট হয়েই তৎকালীন আরব ভূখন্ডের অধিকাংশ মানুষ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিল৷ দুঃখের বিষয় হলো সভ্যতার বিশ্বের উজ্জ্বলতম আদর্শের অধিকারী নূরনবী মোস্তফা (সাঃ) এই আধুনিক যুগেও এক শ্রেণীর কায়েমী স্বার্থবাদী ও বিবেকহীন লোকদের বিদ্বেষী প্রচারণা ও অবমাননার শিকার হচেছন৷ চলতি বছরে ইরানের অন্যতম সেরা গ্রন্থ হিসেবে নির্বাচিত বই "নবী-চরিত, বাস্তব যুক্তির লেখক অধ্যাপক ডক্টর মোস্তফা দেলশাদ তেহরানী এ সম্পর্কে বলেছেন, ইন্টারনেট ও কম্পিউটার প্রযুক্তির মতো তথ্য প্রযুক্তির ব্যাপক অগ্রগতির এই যুগে বিভিন্ন গণমাধ্যম বিশ্ববাসীর কাছে অনেক বাস্তবতা তুলে ধরতে সক্ষম৷ কিন্তু এসব গণমাধ্যমের নিয়ন্ত্রকরা বিশ্ববাসীকে কোনো কোনো বিশেষ বিষয়ে অজ্ঞ রাখতে চান৷ যেমন, এসব গণমাধ্যম ইসলাম ও বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) সম্পর্কে সত্যের ব্যাপক বিকৃতি ঘটিয়ে যাচেছ৷ সত্যি বলতে কি বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) আমাদের এই যুগে অতীতের চেয়েও বেশী মজলুম বা জুলুমের শিকার হচেছন৷ বিভিন্ন মিথ্যা তথ্য ও সূত্রের ওপর ভিত্তি করে কোনো কোনো ওয়েবসাইট বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ)'র নামে এমনসব অপবাদ রটনা করছে যা পুরোপুরি অবাস্তব৷ এ ধরনের রটনা খুবই যন্ত্রণাদায়ক৷ আধুনিক যুগের মানুষকে এটা যথাযথভাবে বুঝতে হবে যে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ)'র অবমাননা কেবল একজন পবিত্র মানুষের অবমাননা নয়৷ বরং তাঁর অবমাননা মানুষের চিরকাংখিত সব ধরনের মহত্ত, সৌন্দর্য ও সৎগুণাবলীকে পর্যুদস্ত করার সমতুল্য৷ ডক্টর মোস্তফা দেলশাদ তেহরানী আরো বলেছেন, নৈতিকতা ও মানবতার এই সীমাগুলোকে বিপর্যস্ত করার মাধ্যমে নৈরাজ্য প্রতিষ্ঠার পথই সুগম করা হচেছ৷ বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) গোটা মানবজাতির সম্পদ এবং তিনি মানবজাতির কাছে যা উপহার দিয়েছেন তাও গোটা মানবজাতির সম্পদ৷ তাই বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ)'র অবমাননার ব্যাপারে বিশ্বের সমস্ত শিক্ষিত মানুষ ও মুক্তমনা মানুষের উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত এবং তাদের উচিত এ মহামানবের আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য ও পবিত্রতার সীমানা সংরক্ষণ করা এবং তাঁর মহান শিক্ষাগুলোকে ছড়িয়ে দেয়া৷ যদিও বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) একটি নির্দিষ্ট স্থানে ও যুগে বসবাস করেছিলেন, কিন্তু তিনি মাটির মানুষ হয়েও স্বর্গীয় সুষমার অধিকারী ছিলেন এবং তিনি ছিলেন স্থান ও কালের গন্ডীর উধের্ব৷ বিশ্বনবী (সাঃ) আজও মানবজাতির পথপ্রদর্শক৷ আর এ জন্যেই পবিত্র কোরআনের সূরা আহজাবে তাঁকে সব মানুষের জন্যে আদর্শ বলা হয়েছে এবং মানুষ যদি তাঁর আদর্শের অনুসারী হয় তাহলেই তারা মুক্তি পাবে৷ ইরাকের বিশিষ্ট অধ্যাপক ও গবেষক হুজ্জাতুল ইসলাম বাক্বের শারীফ আল ক্বোরাইশী বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ)'র ব্যক্তিত্ব ও বৈশিষ্ট সম্পর্কে বলেছেন, রাসূলে পাক (সাঃ) সদাচারণ ও উন্নত নৈতিক গুণাবলীর দিক থেকে নজিরবিহীন, তিনি ছিলেন মহান আল্লাহর নিদর্শন৷ তাঁর ব্যক্তিত্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো দৃঢ় ও অদম্য ইচছা-শক্তি৷ ইসলামের প্রাথমিক দিনগুলোতে অজ্ঞতার আঁধারে নিমজ্জিত শক্তিগুলো রাসূলে পাক (সাঃ)'র মোকাবেলায় সমস্ত সামর্থ নিয়ে সংঘবদ্ধ এবং নানা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছিল৷ কিন্তু বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) বলেছিলেন, তোমরা যদি আমার এক হাতে সূর্য এবং অন্য হাতে চাঁদ এনে দাও তাহলেও আমি সত্য ধর্ম প্রচারের এ দায়িত্ব ত্যাগ করবো না৷ এ ধরনের অদম্য ইচছাশক্তি ও দৃঢ় প্রতিজ্ঞার মাধ্যমেই বিশ্বনবী (সাঃ) ইতিহাসের গতি বদলে দিয়েছিলেন এবং পাপ-পংকিলতা ও লক্ষ্যহীনতায় মগ্ন সমাজকে সৌন্দর্য, কল্যাণ ও প্রাচুর্যে পরিপূর্ণ জীবনের দিকে পরিচালিত করেন৷ বিখ্যাত অধ্যাপক ও গবেষক ডক্টর রহীমপুর বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ)'র প্রতি বিদ্বেষী আচরণ সম্পর্কে বলেছেন, নূরনবী (সাঃ) সম্পর্কে সন্দেহবাদী ও প্রতিক্রিয়াশীল বা নেতিবাচক নীতি সেই জাহেলী যুগ থেকেই প্রচলিত ছিল৷ বিদ্বেষী এই নীতি পরবর্তিতে খৃষ্টান মিশনারীদের মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেয় এবং এই ধারা আজও বিভিন্ন পন্থায় ও কলেবরে অব্যাহত রয়েছে৷ সেই যুগে রাসূল (সাঃ)কে অস্বীকার করা হতো৷ আজ তারা বলছে ইসলাম ধর্মের ভাষা সভ্যতা-বর্জিত বা সেকেলে৷ অতীতে তারা বলতো, মুহাম্মাদ (সাঃ) যাদুকর! আজ ইসলাম ও সত্যের বিরোধীরা বলছে, নবীরা ছিলেন ক্যারিজমাটিক তথা জনগণের মধ্যে গভীর প্রভাব সৃষ্টিকারী ব্যক্তিত্ব এবং তারা সমাজকে সংস্কার করতেন৷ অতীতে তারা রাসূলে খোদা (সাঃ)'র নবুওত ও রেসালাতকে অস্বীকার করতো৷ বর্তমানে তারা প্রতারণামূলক শব্দের আশ্রয় নিয়ে একই অপবাদ দিচেছ৷ নবী-রাসূলগণ ধর্মের কেন্দ্রবিন্দু বলে তারা ঠিক এখানেই আঘাত করছে৷ ডক্টর রহীমপুর আরো বলেন, নবী-রাসূলগণ মানব সভ্যতার সবচেয়ে বড় সামাজিক, জ্ঞানগত ও নৈতিক বিপ্লবগুলোর উৎস৷ তাই সামাজিক ও চিন্তাগত সমস্ত সাধনা বা প্রচেষ্টা ও সংঘাত নবী-রাসূলগণের আহবানকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়েছে৷ কেউ যদি নবুওতের মূল নীতি বা ধারণাকেই অগ্রাহ্য করতে পারে, কিংবা নবী-রাসূলগণের ব্যক্তিত্বকে এমনভাবে বিকৃত করে তুলে ধরতে পারে যে তাঁদের বক্তব্য ও আচার-আচরণ মানুষের জন্যে আদর্শস্থানীয় বলে বিবেচিত না হয় তাহলে ধর্ম বলে ভালো কোনো কিছুর অস্তিত্ব থাকে না৷ এ অবস্থায় ধর্মের অর্থ হবে অস্পষ্টতা ও কিছু ব্যক্তির খেয়ালীপনা মাত্র এবং ধর্ম হয়ে পড়বে মানুষের জীবনে প্রভাবহীন একটি বিষয়৷ কিন্তু নবী-রাসূলগণ এসেছেন অজ্ঞতা, শির্ক, জুলুম, অবিচার ও অন্যের অধিকার লংঘন প্রতিরোধ করতে এবং মানুষের আচার-আচরণের ধারায় বিপ্লব সৃষ্টি করতে৷ বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) ছিলেন নবীগণের মধ্যেও সবচেয়ে কোমল ও দয়াদ্র হৃদয়ের অধিকারী৷ মানব-ইতিহাসে তাঁর মতো পবিত্র ও উদার চিত্তের মানুষ আর কখনও আসেনি এবং ভবিষ্যতেও আসবে না৷ ডক্টর রহীমপুর আরো বলেন, আর এসব কারণেই বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) আল্লাহর সর্বশেষ দূত বা প্রতিনিধি৷ বর্তমান ও ভবিষ্যতেও মানুষের জীবনের সব ধরনের সমস্যা সমাধানের চাবি রয়েছে তাঁরই জীবনাদর্শে৷ তিনি ইতিহাসের সব যুগের জন্যে এবং সব মানুষের জন্যেই রাসূল৷ মানুষের জীবনের সবচেয়ে ক্ষুদ্র বা খুটিনাটি দিক থেকে শুরু করে পরকালীন, রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক জীবন থেকে তিনি বিচিছন্ন নন৷ নূরনবী (সাঃ) মানবতা, ন্যায়বিচার ও যুক্তির ওপর জোর দিয়ে মানব জাতির জন্যে সবচেয়ে ভালো পথ প্রদর্শন করেছেন৷ মহান আল্লাহর অশেষ শোকর, আমরা বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) সম্পর্কে আলোচনার সুযোগ পেয়েছি৷ তিনি ছিলেন এমন একজন মহামানব যিনি মানুষকে ভ্রাতৃত্ব ও দয়া শিখিয়েছেন যে মানুষ ছিল সহিংসতা ও নৃশংসতায় অভ্যস্ত৷ ইসলামের শ্রেষ্ঠতম এই ব্যক্তিত্বের প্রতি রইলো আমাদের অসংখ্য সালাম ও দরুদ৷ পবিত্র কোরআনের ভাষায়- মহান আল্লাহ তাঁকে অনুগ্রহ করেছেন ; ফেরেশতাগণও তাঁর জন্যে অনুগ্রহ প্রার্থনা করেন৷ হে মুমিন বা বিশ্বাসীগণ! তোমরাও নবীর জন্যে অনুগ্রহ প্রার্থনা কর এবং তাঁকে উত্তমরূপে অভিবাদন কর৷ (সূরা আহজাব-৫৬)
     
     
  • RelatedArticle
  • নূরনবী মোস্তফা (সাঃ) ( ৩৯তম পর্ব)
    নূরনবী মোস্তফা (সাঃ) ( ৩৭তম পর্ব)
    নূরনবী মোস্তফা (সাঃ) ( ৩৪তম পর্ব)
    নূরনবী মোস্তফা (সাঃ) (৩২তম পর্ব)
    নূরনবী মোস্তফা (সাঃ) ( ৩০ তম পর্ব)
    নূরনবী মোস্তফা (সাঃ) ( ২৮ তম পর্ব)
    নূরনবী মোস্তফা (সাঃ) ( ২৬ তম পর্ব)
    নূরনবী মোস্তফা (সাঃ) ( ২৪ তম পর্ব)
    নূরনবী মোস্তফা (সাঃ) ( ২২ তম পর্ব)
    নূরনবী মোস্তফা (সাঃ) ( ২০ তম পর্ব)
    নূরনবী মোস্তফা (সাঃ) ( ১৮ তম পর্ব)
    নূরনবী মোস্তফা (সাঃ) ( ১৬তম পর্ব)
    নূরনবী মোস্তফা (সাঃ) ( ১৪তম পর্ব)
    নূরনবী মোস্তফা (সাঃ) ( ১২তম পর্ব)
    নূরনবী মোস্তফা (সাঃ) ( ১০ম পর্ব)
    নূরনবী মোস্তফা (সাঃ) (৯ম পর্ব)
    নূরনবী মোস্তফা (সাঃ) (৮ম পর্ব)
    নূরনবী মোস্তফা (সাঃ) (৭ম পর্ব)
    নূরনবী মোস্তফা (সাঃ) (৬ষ্ঠ পর্ব)
    নূরনবী মোস্তফা ( ৫ম পর্ব )