সমাজবদ্ধ ও ঐক্যবদ্ধ থাকাই মানুষের ফিতরাত বা স্বভাব। শত্রুর হামলার মুখে ঐক্য বা সমাজবদ্ধতা মানুষের জীবনে শুধু প্রয়োজনীয়ই নয়, অপরিহার্যও। তাই সৃষ্টির শুরু থেকে মানুষ শুধু খাদ্যই খোঁজেনি বা ঘরই গড়েনি, একতার বন্ধনও গড়েছে। পরিবার, সমাজ, সমিতি ও রাষ্ট্র গড়ে উঠেছে তো সে প্রয়োজন পুরনের অপরিহার্যতায়। ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে নানা বিষয়ে বিতর্ক থাকতে পারে, কিন্তু একতা বা সংগঠিত হওয়ার গুরুত্ব নিয়ে নানা ধর্ম ও নানা মতবাদের মানুষের মাঝে বিতর্ক নেই। ইসলাম তো একতাবদ্ধ হওয়াকে অপরিহার্য ইবাদত বলে, বিভক্তির প্রতিটি উদ্যোগ বা প্রয়াসকে বলে হারাম। কোন কোন ক্ষেত্রে মুসলমানদের মাঝে বিভক্তি সৃষ্টি করা তো হত্যা যোগ্য অপরাধ। এ ব্যাপারে কঠোর নিষেধাজ্ঞা এসেছে নবীজী (সাঃ) থেকে। বলা হযেছে, “এ ইসলামি উম্মাহর সুদৃঢ় সূত্রকে যে ব্যক্তি ছিন্ন করতে চাইবে, তাকে তরবারী দ্বারা শায়েস্তা কর –সে ব্যক্তি যে কেউ হোক না কেন।” -সহিহ আল-মুসলিম।
পবিত্র কোরআন একটি পরিপূর্ণ বিধান। এটি হেদায়েতের গ্রন্থ। কোরআনের উপর এমন ঈমান থাকাটি প্রতিটি মুসলমানের জন্য এতটাই জরুরী যে এ ঈমানটুকু না থাকলে সে আর মুসলমানই থাকে না। আর এমন ঈমানের সাথে যে কর্মটিও সমান ভাবে জরুরী তা হল আল্লাহর দেওয়া হেদায়েতের এ গ্রন্থটির পরিপূর্ণ অনুসরণ। কিসের ভিত্তিতে একাবদ্ধ হবে এবং কিসের ভিত্তিতে সমাজ ও সভ্যতার জন্ম দিবে একজন মুসলমান তো সেটির সঠিক দিকনির্দেশনা পেতে পারে একমাত্র কোরআন থেকেই। মুসলমানের একতার ভিত্তি ভাষা, বর্ণ, গোত্র বা ভূগোল নয়, শ্রেনী-চেতনা বা পার্থিব স্বার্থ-চেতনাও নয়। এমন একতা ইসলামে হারাম। কোনরূপ সেকুলার বা পার্থিব এজেন্ডা নিয়ে মুসলমানগণ একতাবদ্ধ হয় না। জান-মাল দূরে থাক, সে লক্ষ্যে ক্ষণিকের সামান্য মুহুর্তও তারা ব্যয় করে না। তাদের মধ্যে যেটি কাজ করে সেটি পরকালের অনন্ত সময়ের স্বার্থ চেতনা। কাজ করে আল্লাহতায়ালাকে খুশি করার ভাবনা। জান্নাত-প্রাপ্তির সে প্রবল আকাঙ্খা ঈমানদারকে ধাবিত করে এক পবিত্র মিশনে। আর সেটি হল, আল্লাহর দ্বীন তথা ইসলামের বিজয়। এখান থেকেই জন্ম নেয় উম্মাহর ধারণা। উম্মাহর অর্থ হল এমন একটি জনগোষ্ঠি যারা একতাবদ্ধ হয় ভাষা, বর্ণ ও অঞ্চল-ভিত্তিক ক্ষুদ্র স্বার্থ-চেতনার উর্দ্ধে উঠে। এখানে বাঁধনটি হয় ঈমানের, ভাষা বা ভূগোলের নয়। তারা কাজ করে নিছক মহান আল্লাহর নির্দেশিত মিশনটির বাস্তবায়নে। মুসলিম উম্মাহ তাই বিভক্ত হয় না ভাষা ভিত্তিক বা আঞ্চলিক বিভক্তির সীমারেখা দিয়ে। উম্মাহর বিস্তার তাই গ্লোবাল তথা বিশ্বব্যাপী। এখানে শত্রু-মিত্র নির্ণীত হয় ইসলাম ও অনৈসলামের ভিত্তিতে, কে কতটা আপন সেটির মাপ-কাঠি এখানে ঈমান ও তাকওয়া। ঈমানহীনেরা তাই রক্তে আপন হলেও গণ্য হয় শত্রু রূপে। এ ব্যাপারে আল্লাহতায়ালার ঘোষণা হলঃ “তোমাদের পিতামাতা এবং ভাইও যদি আল্লাহর প্রতি ঈমান আনার পরিবর্তে কুফরকে পছন্দ করে ও ভালবাসে, তবে তোমরা তাদেরকেও আপন লোক রূপে গ্রহণ করবে না। তোমাদের মধ্য থেকে কোন ব্যক্তি যদি তাদেরকে বন্ধু রূপে মনে করে তবে সে নিশ্চয়ই যালেমদের মধ্যে গণ্য হবে।”- সুরা তাওবা, আয়াত ২৩। উম্মাহর চেতনায় ঈমান এবং অভিন্ন মিশনের বিষয়টি এতই গুরুত্বপূর্ণ যে, পিতামাতা এবং আপন ভাইও যদি ভিন্ন বিশ্বাসের হয় তবে সে মুসলিম উম্মাহর সদস্য হতে পারে না। এখানে ভাষা ও ভৌগলিক পরিচয় গুরুত্বহীন। এমনকি নিজের স্ত্রী এবং সন্তানেরাও যদি ঈমানের পরিচয়ে ভিন্নতর হয় তবে তারাও আপন লোক হিসাবে গন্য হয় না। কোরআনে বলা হয়েছে, “তোমাদের স্ত্রী এবং সন্তানদের মধ্যে এমন লোকও আছে, যারা তোমাদের দুষমন (ইসলামের ব্যাপারে)। তাদের সম্পর্কে সাবধান হয়ে যাও।” সুরা আত তাগাবুন, সুরা ১৪।
তাকওয়া-ভিত্তিক সে চেতনায় নানা বর্ণ ও নানা ভাষার মানুষ তখন এক ময়দানে কাজ করে, তারা জন্ম দেয় এক অভিন্ন রাষ্ট্রের। নবীজীর আমলে তো সেটিই হয়েছিল। তখন আরব, পারস্য, আফ্রিকা, রোমের মানুষ একই সমাজ ও একই রাষ্ট্রের পতাকাতলে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতে পেরেছিলেন। ১৯৪৭-এ এমন একটি উম্মাহর চেতনার উম্মেষ ঘটেছিল ভারতীয় উপমহাদেশে এবং তখন নানা ভাষা ও নানা প্রদেশের মানুষ বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তানের জন্ম দিয়েছিল। বর্ণবাদ বা জাতিবাদে সেটি অসম্ভব। বরং জাতিয়তাবাদে যে ঘটে সেটি হল, নানা ভাষা, নানা অঞ্চল ও নানা বর্ণের মানুষে সংমিশ্রণে গড়ে উঠা একটি বৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্রের বিনাশ। উসমানিয়া খেলাফত এ চেতনায় ভেঙ্গে গেছে। ভেঙ্গে গেছে পাকিস্তান। ভাঙ্গতে বসেছে ইরাক। তাই উম্মাহর চেতনা যেখানে মুসলমানদের জন্য গঠনমুখি, জাতিয়তাবাদ সেখানে ধ্বংসমুখি। ফলে উম্মাহর চেতনা মুসলমান ও ইসলামের জন্য আনে গৌরব, আর জাতিয়তাবাদ বাড়ায় অপমান। বাংলাদেশের জন্য ভিক্ষার ঝুলির অপবাদ অর্জিত হয়েছিল তো এ জাতিয়তাবাদের বিজয়ের কারণেই। জাতিয়তাবাদ একটি জনবসতির মানুষকে বাঁধে একটি বিশেষ ভাষা, বর্ণ ও দেশ-ভিত্তিক স্বার্থ-চেতনায়, সে লক্ষ্য-পূরণে এমনকি অনিবার্য করে অন্য ভাষার বা অন্য দেশের মানুষের সাথে সংঘাতও। অন্য ভাষার মানুষকে ভিন্ন ভাবে দেখাটাই তাই একজন জাতিয়তাবাদীর স্বভাব। জাতিয়তাবাদের সাথে এখানেই ইসলামের বড় পার্থক্য।
শুধু রাজনীতি বা যুদ্ধ-বিগ্রহে নয়, বেঁচে থাকা ও প্রাণদানের ক্ষেত্রেও ঈমানদারের লক্ষ্য হয় একমাত্র মহান আল্লাহকে খুশি করা। মুসলমানের জীবনের সে বিশেষ মিশনটি অতি সুন্দর ভাবে বলে দেওয়া হয়েছে পবিত্র কোরআনে। মহান আল্লাহতায়ালা নবী করীম (সাঃ)কে উদ্দেশ্য করে বলছেনঃ “আপনি বলুনঃ আমার নামায, আমার কোরবানী এবং আমার জীবন ও মরণ বিশ্ব-প্রতিপালক আল্লাহরই জন্য।” -সুরা আনয়াম, আয়াত ১৬২। এ আয়াতটি নিছক নবীজী (সাঃ) এর উদ্দেশ্যে নয়, বরং প্রতিটি ঈমানদারের জন্য। এ আয়াতে ঘোষিত হয়েছে মুসলমানের জীবনের মিশন স্টেটমেন্ট। মুসলমান কেন বাঁচবে এবং কি ভাবেই বা মরবে, সেটিই এখানে সুস্পষ্ট ভাবে বলে দেওয়া হয়েছে। এবং সেটি হল, আল্লাহর দ্বীনের বিজয়ের জন্য। এটিই তার বাঁচবার মূল মিশন। নবী-রাসূলগণ এ মিশন নিয়েই বেঁচেছেন। একই রূপ অভিন্ন মিশনে বেঁচেছেন সাহাবাগণও। আর সে মিশনে আত্ম-নিয়োগের মধ্য দিয়ে একজন মুসলমান অর্জন করে আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং সে সাথে পরকালের সফলতা। আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত এটি এমন এক মিশন যার সাথে সম্পৃক্ত থাকার বাধ্যবাধকতা রয়েছে প্রতিটি মুসলমানের উপর।
মুসলিম উম্মাহর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হল, আল্লাহর দ্বীনের প্রতিষ্ঠা। এরচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ কাজ দ্বিতীয়টি নেই। এ কাজের এজন্যই তারা সংঘটিত হয়। এ লক্ষ্যেই তারা রাজনীতি করে এবং এ লক্ষ্যেই তারা সমাজ ও রাষ্ট্র নির্মাণ করে। একাজের তারা প্রয়োজনে প্রাণও দেয়। এক্ষেত্রে ব্যর্থ হলে ব্যর্থ হয় মুসলমানের বাঁচাটাই। আরো লক্ষণীয় হল, আল্লাহর দ্বীনের প্রতিষ্ঠার এমন ইচ্ছা বা সিদ্ধান্তটি মুসলমানের নিজের নয়, বরং সেটি এসেছে মহান আল্লাহতায়ালা থেকে। তিনি ঘোষণা করেছেনঃ “তিনিই সঠিক পথ-নির্দেশ ও সত্য দ্বীন সহ রাসূল পাঠিয়েছেন যাতে তা সকল ধর্মের উপর বিজয়ি হতে পারে, যদিও মুশরিকদের কাছে সেটি অপছন্দের।” –সুরা সাফ, আয়াত ৯। একাজ ফেরেশতাদের নয়। কারণ এ পৃথিবী ফেরেশতাদের জন্য পরীক্ষা-ক্ষেত্র নয়, বরং এখানে পরীক্ষা হয় মানুষের। আল্লাহর নির্দেশিত সে মিশনে কে কতটা আত্মনিয়োগ করে বা কোরবানী পেশ করে সে পরীক্ষাটি তো হয় মূলতঃ সেটির ভিত্তিতেই। সাহাবাগণ আল্লাহতায়ালার কাছে তো এজন্যই প্রিয়। কারণ তারা নিজেদের সমগ্র সামগ্রী এ কাজে বিণিয়োগ করেছিলেন। শতকরা ৬০ ভাগের বেশী সাহাবী শহীদ হয়েছেন। নিজ দেশে দ্বীনের বিজয় সমাধা করে কোরআনের পয়গাম নিয়ে তারা নিজ পাহাড়-পর্বত, নদীনালা, মরুভূমি অতিক্রম করে নানা জনপদে গিয়ে পৌছেছেন। অথচ কোটি কোটি মুসলমানের দেশেও ইসলাম আজ পরাজিত। বাংলাদেশের আজকের একটি জেলার সমান মুসলিম জনসংখ্যা তখন খোলাফায়ে রাশেদার ছিল না। অথচ তখন আল্লাহর দ্বীনের বিজয় এসেছিল। অথচ আজ দায়িত্বপালনে সীমাহীন অবহেলার কারণে মুসলমানদের সংখ্যা বাড়লেও, প্রতিষ্ঠা বাড়ছে না ইসলামের। কথা হল, মুসলিম জনসংখ্যা আজকের তুলনায় আরো দশগুণ বাড়লেও কি ইসলামের প্রতিষ্ঠা বাড়বে? বাড়তি মুসলিম জনসংখ্যা যদি জাতিয়তাবাদ, সমাজবাদ বা সেকুলারিজমের মিছিলে হারিয়ে যায়, তবে এতে মুসলমানের কল্যাণ কোথায়? বরং তখন উৎসব বাড়বে জাতিয়তাবাদ, সমাজবাদ বা সেকুলারিজমের শিবিরে।
ইতিহাসে যত রক্তক্ষয়, যত যুদ্ধ-বিগ্রহ ও বিপর্যয় নেমে এসেছে সেটি খাদ্য-পানীয়, পোষাক-পরিচ্ছদ, বসবাস বা ঘর-বাধার কৌশলের ভিন্নতার কারণে নয়। বরং একতাবদ্ধ হওয়ার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য এবং বিপুল গণশক্তির বিণিয়োগটি কোন লক্ষ্যে ও কিভাবে হবে তার উপর। গণশক্তির সে বিস্ফোরণটি যদি জাতিয়তাবাদ, ফ্যাসীবাদ বা সমাজবাদের নামে হয়, তবে সেটি সমাজ ও রাষ্ট্রে যে কত বড় বিপর্যয় আনতে পারে সে প্রমাণ তো ইতিহাসে প্রচুর। তাই এ প্রসঙ্গে সুস্পষ্ট হেদায়েত রয়েছে পবিত্র কোরআনে। সে হেদায়েতটি হল, ব্যক্তি ও সমষ্টির উন্নয়নে মূল উপাদানটি হতে হবে তাকওয়া বা আল্লাহর ভয়। এটি শুধু এ দুনিয়ার জীবনের সুখ-শান্তির জন্যই অপরিহার্য নয়, জান্নাতে প্রবেশের লক্ষ্যেও এটি অপরিহার্য। আল্লাহপাক মানব জাতিকে এজন্য সৃষ্টি করেননি যে, তার সমুদয় সামর্থ ব্যয় হবে নিছক খাদ্য-পাণীয়, আরাম-আয়েশ ও আনন্দফুর্তির আয়োজন বৃদ্ধিতে। এবং অবশেষে হারিয়ে যাবে দুনিয়া থেকে! খাদ্য-আহরণের ব্যস্ততা তো পশুদেরও। আল্লাহপাক মানুষের জন্য শুধু পৃথিবীর এ স্বল্পকালীন জীবনই সৃষ্টি করেননি, সৃষ্টি করেছেন আখেরাতের অন্তহীন জীবনও। তিনি মানুষের জন্য শুধু পার্থিব কল্যাণই চান না, চান আখেরাতের অনন্ত কল্যাণ ও সফলতাও। তবে সে সফলতাটি অর্জন করতে হবে তার নিজগুণে। সেটির অর্জনে অপরিহার্য গূণটি হল আল্লাহর ভয়। ইসলামি পরিভাষায় যা হল তাকওয়া। কোরআনে বলা হয়েছে, “হে ঈমানদারগণ, আল্লাহকে যেমন ভয় করা উচিত ঠিক তেমনি ভয় কর। এবং অবশ্যই মুসলমান না হয়ে মৃত্যুবরণ করো না।” সুরা আল-ইমরান আয়াত ১০২। আল্লাহপাক মোমেনের কল্যাণ চান। তিনি চান তাঁর জান্নাতকে ঈমানদারদেরকে দিয়ে পূরণ করতে। তবে হুশিয়ার করে দিচ্ছেন, শুধু আল্লাহর উপর বিশ্বাস বা সামান্য আল্লাহ-ভীতির কারণে কেউ জান্নাতে ঢুকতে পারবে না। এ জন্য যে চাবিটি অপরিহার্য তা হল, আল্লাহকে যে পরিমাণ ভয় করা উচিত সে পরিমাণ ভয় তার হৃদয়ে অবশ্যই থাকতে হবে। মৃত্যুর পর আর সেটি অর্জনের সুযোগ থাকবে না। তাই সতর্ক করেছেন, সেটি অর্জন না করে যেন মৃত্যূবরন না করে।
তাকওয়া অর্জনে নির্দেশ দানের পর আল্লাহতায়ালা অপর যে নির্দেশটি একই সূরার পরবর্তী আয়াতে দিয়েছেন তা হল, “আর তোমরা সকলে মিলে আল্লাহর রশিকে আঁকড়ে ধর এবং পরস্পরে বিচ্ছিন্ন হয়ো না। তোমাদের উপর আল্লাহর অনুগ্রহের কথা স্মরণ কর, এক সময় তোমরা পরস্পরে প্রকাশ্য দুশমন ছিলে, কিন্তু আল্লাহ তোমাদের মনে পারস্পরিক ভালবাসা জাগিয়ে দিয়েছেন। এবং তোমরা তাঁর নেয়ামত –ইসলামের বদৌলতে পরস্পরে ভ্রাতৃবন্ধনে আবদ্ধ হলে। তোমরা তো এক গভীর প্রজ্জ্বলিত অগ্নি-গহ্বরের প্রান্তে দাঁড়িয়ে ছিলে, আল্লাহ তায়ালা তোমাদেরকে তা থেকে রক্ষা করেছেন।”- সুরা আল-ইমরান, আয়াত ১০২-১০৩। অর্থাৎ তাকওয়া অর্জনের অর্থ এ নয় যে, সে ব্যক্তিটি আল্লাহভীতি নিয়ে জায়নামাযে বসে থাকবে। বা শুধু নামায-রোযা, কোরআন তেলাওয়াত, তাসবিহ তাহলিলের মাঝে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখবে। বরং তাঁকে অন্যান্য মুসলমানের সাথে একত্রে আল্লাহর রশিকে আঁকড়ে ধরতে বলা হয়েছে। মুসলমানের একতার ভিত্তি রূপে এখানে আল্লাহর রশির কথা বলা হয়েছে। প্রশ্ন হল, আল্লাহর সে রশিটি কি? সেটি হল আল-কোরআন। এবং সেটি বুঝাতে একই সুরার পূর্ববতী আয়াতে বলা হয়েছেঃ
“ওয়া মাই ইয়াতাছিমু বিল্লাহি ফাকাদ হুদিয়া ইলা ছিরাতিম মোস্তাকীম।” অর্থঃ আর যারাই আল্লাহর কথা দৃঢ় ভাবে ধারণ করবে তারাই হেদায়াত প্রাপ্ত হবে সরল পথের দিকে।- সুরা আল-ইমরান, আয়াত ১০১।
অর্থাৎ হেদায়াত লাভের পথ একটিই, আর তা হল আল্লাহর নাযিলকৃত পবিত্র কোরআনের আয়াতগুলোকে শক্ত ভাবে অনুসরণ করা। এটিই পরকালে নাজাত বা কল্যাণের একমাত্র রাস্তা। কিন্তু কথা হল, যারা আল্লাহর সে আয়াতগুলোকে পড়লোই না এবং পড়লেও যারা সে আয়াতের অর্থ বুঝলো না, তারা সেটিকে আঁকড়ে ধরবে কি করে? অনুসরণই বা করবে কি করে? ফলে গড়ে উঠবে কি করে উম্মাহর সে ধারণা? প্রতিষ্ঠা পাবে কি আল্লাহর দ্বীন?
আল্লাহর রশিকে আঁকড়ে ধরার সাথে আরও বলা হয়েছেঃ “আর তোমাদের মধ্যে এমন একটি উম্মাহ অবশ্যই থাকতে হবে যারা (মানুষকে) ডাকবে কল্যাণের দিকে এবং নির্দেশ দেবে ভাল কাজের এবং রুখবে অন্যায় কাজ থেকে; আর তারাই সফলকাম।” -সুরা আল-ইমরান, আয়াত ১০৬। এ আয়াতে কোন দল নয়, গোত্র নয়, জাতিসত্বা নয়, বলা হয়েছে উম্মাহর জন্ম দিতে। আর এমন উম্মাহর লক্ষ্য হবে কোন দলীয়, গোত্রীয় বা জাতীয় স্বার্থকে বিজয়ী করা নয়। কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর হাতে ক্ষমতা দেওয়াও নয়। বরং সেটি হল, ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা এবং অন্যায়ের প্রতিরোধ। এবং এটাই হল ইহকাল ও পরকালে সফলতার পথ। তবে ন্যায়ের হুকুম ও অন্যায়ের নির্মূলের যে হুকুম দেওয়া হয়েছে সে ন্যায়-অন্যায় যাচাইয়ের একটি সুর্নিদ্দিষ্ট ভিত্তিও থাকতে হবে। এবং সেটি পবিত্র কোরআন। মানুষের গড়া আইন, শাসনতন্ত্র বা দর্শন নয়। কোরআনে বর্ণীত সে ন্যায়-নীতি প্রতিষ্ঠা পেলে তখন ন্যায় বিচার পায় প্রতিটি ব্যক্তি, অঞ্চল ও জনপদ। বিভিন্ন গোত্র, বর্ণ, ভাষা, অঞ্চল ও দেশের সাথে তখন অবিচার হয় না। ন্যায় বিচার একমাত্র এ পথেই সার্বজনীন হয়, কারণ আল্লাহর আইন বর্ণ, গোত্র বা মুখের ভাষার দিকে তাকিয়ে বিচার করে না। মুসলিম দেশগুলোতে আজ শত শত দল, তবে সেসব দলের মিশন ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা নয়, অন্যায়ের প্রতিরোধও নয়। বরং অধিকাংশ দলই পরিণত হয়েছে অন্যায় ও দুর্বৃত্তি বিস্তারের হাতিয়ারে। ফলে মুসলিম দেশগুলো দুর্নীতিতে বিশ্বজুড়া রেকর্ড গড়ছে। আর তারই উদাহরণ হল বাংলাদেশ।
শান্তির একমাত্র পথ ইসলাম। অন্য মতবাদ বা ধর্মে শান্তি আসবে সে কথায় বিশ্বাস করাই শিরক। অনৈসলামিক আদর্শ বা মতবাদের প্রতিষ্ঠায় মানুষের সামর্থের অপচয়ই শুধু বাড়ে না, বিপর্যয়ও বাড়ে। এবং সেটি অতি ভয়ানক ভাবে। জাতিয়তাবাদ, বর্ণবাদ, নাজিবাদ বা ফ্যাসিবাদের নামে বিশ্বজুড়ে সেটিই ঘটেছে। এরই প্রমাণ, প্রায় সাত কোটি মানুষ প্রাণ হারিয়েছে বিগত শতাব্দীর দুটি বিশ্বযুদ্ধে। এ জাতিয়তাবাদী চেতনাতেই খন্ডিত ও শক্তিহীন হয় মুসলিম বিশ্ব এবং অসম্ভব করেছে মুসলমানদের একতা ও উত্থানকে। মুসলিম উম্মাহর এতবড় ক্ষতি কোন মুশরিক বা কাফের বাহিনীর হাতে হয়নি, যা হয়েছে নিজেদের মাঝে জন্ম নেওয়া জাতিয়তাবাদীদের হাতে। জাতি, অঞ্চল ও বর্ণ-ভিত্তিক বিভেদ এভাবে সমগ্র মানব জাতির এবং সেসাথে মুসলিম উম্মাহর ভয়ানক ক্ষতি করেছে। তবে এ বিনাশী মতবাদের নেতা ও অনুসারিদের বড় বিপদটি ঘটবে পরকালে। তখন মহান আল্লাহর দরবারে কৈফিয়ত দিতে হবে তাদের প্রতিটি কর্ম ও আচরণের। যে দৈহিক, আর্থিক এবং বুদ্ধিবৃত্তিক সামর্থ তাদেরকে দেওয়া হয়েছিল, তা তো ছিল তাদের উপর অর্পিত মহামূল্য আমানত। সেটি ব্যয় হওয়া উচিত ছিল একমাত্র আল্লাহর দ্বীনের বিজয়ে। সেটি না করে সে সামর্থের খেয়ানত হয়েছে জাতি, বর্ণ, ভাষা ও ভূগোল-ভিত্তিক অভিলাষ পুরণে?
সমস্যা হল, বাংলাদেশের ন্যায় অধিকাংশ মুসলিম দেশে শুধু সূদ, ঘুষ, বেশ্যাবৃত্তি, সন্ত্রাস ও নারী পাচারের ন্যায় নানাবিধ হারাম কাজই বাড়েনি, প্রবল ভাবে বেড়েছে জাতিয়তাবাদের ন্যায় হারাম মতবাদটিও। মুসলমান নামধারীরা যেমন সূদ-ঘুষ খেতে বাছবিচার করেনা, তেমন বাছবিচার করে না জাতিয়তাবাদের ন্যায় হারাম মতবাদটিকে রাজনীতির পুজনীয় আদর্শ রূপে বরণ করতে। কথা হল, এটি কি আল্লাহর কম অবাধ্যতা? আল্লাহপাক কি এমন অবাধ্য মানুষদেরকে ইজ্জত দেন, দেন কি বিজয়ের গৌরব? তাই বিশ্বে মুসলিম দেশের সংখ্যা বাড়লেও ইজ্জত বাড়েনি। ক্ষুদ্ররাষ্ট্র ইসরাইলের যে ইজ্জত ও গৌরব আছে ৫৫টি মুসলিম রাষ্ট্র ও ১৫০ কোটি মুসলমানের সে ইজ্জত নেই। ইসরাইলে অন্ততঃ নানা ভাষাভাষি ও নানাদেশের ইহুদীদের প্রবেশাধিকার আছে এবং নাগরিক হওয়ার অধিকারও আছে। কিন্তু সে অধিকার কোন মুসলিম দেশই অন্য দেশের মুসলমানদের দেয় না। বরং গড়ে তুলেছে নানারূপ বিভক্তির দেওয়াল। মুসলমানদের জন্য এটি এক প্রকান্ড ব্যর্থতা। আর এ ব্যর্থতার জন্য বিদেশী শত্রুরা ততটা দায়ী নয় যতটা দায়ী তারা নিজেরা। তাদের আগ্রহ নিছক নিজ নিজ ভাষা বা ভূগোল-ভিত্তিক জাতি-রূপে বেড়ে উঠায়, ইসলামের বিজয় বা গৌরব নয়। অধিকাংশ মুসলমান ভেসে গেছে জাতীয়তাবাদী চেতনার প্রবল জোয়ারে, বা দলীয় ও ব্যক্তি-স্বার্থের ভাবনায়। আর এমন ভেসে যাওয়া মানুষ কি কোন একতাবদ্ধ উম্মাহ রূপে বেড়ে উঠতে পারে? পারেনি। তারা ব্যর্থ হয়েছে, কোরআনে ঘোষিত আল্লাহর নির্দেশিত এজেন্ডাকে নিজেদের রাজনীতির এজেন্ডা বানাতে। কথা হল, এমন মুসলমানদের নিয়ে কি আল্লাহ ও তার রাসূল কি খুশি হতে পারেন? আর যারা দুনিয়ার জীবনে অর্পিত দায়িত্ব পালনে এতটা অবহেলা করল তারা কি আখেরাতেও কোন কল্যাণ পাবে? ২৫/১২/০৮