পাঠক! কোরআনের আলোর আজকের আসরে আমরা সূরা ইউসুফেরর ৭৮ থেকে ৮২ আয়াতের অনুবাদ ও সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা উপস্থাপন করবো। প্রথমে ৭৮ ও ৭৯ নম্বর আয়াতের অর্থ জানা যাক ।
" তারা বলতে লাগলো, হে আজিজ ! তার পিতা আছেন, যিনি অতিশয় বৃদ্ধ । সুতরাং তার স্থলে আপনি আমাদের একজনকে রেখে দিন। আমাদের দৃষ্টিতে আপনি একজন অনুগ্রহশীল ব্যক্তি। (ইউসুফ) বললো, যার নিকট আমরা আমাদের মাল পেয়েছি, তাকে ছাড়া অন্যকে রাখার অপরাধ হতে আল্লাহর স্মরণ নিচ্ছি। এরূপ করলে আমরা অবশ্যই সীমা লংঘনকারীদের অন্তর্ভূক্ত হয়ে যাবো। "
গত সপ্তায় আমরা আলোচনা করেছি, হযরত ইউসুফ (আঃ) ছোট ভাই বেনইয়ামিনকে নিজের কাছে রেখে দেয়ার জন্য একটি পরিকল্পনার আশ্রয় নিলেন। তিনি একটি মূল্যবান শাহীপাত্র গোপনে বেনইয়ামিনের মালপত্রের মধ্যে ঢুকিয়ে দেয়। এরপর রাজরক্ষীরা ঐ মূল্যবান পাত্রটি বেনইয়ামিনের রসদপত্রের মধ্যে পেয়ে তাকে চোর হিসেবে সাব্যস্ত করে এবং আটক করে। এই আয়াতে বলা হচ্ছে, হযরত ইউসুফের বৈমাত্রেয় ভাইরা যখন দেখলো, বেনইয়ামিন মহা ঝামেলায় পড়ে গেছে এবং তাকে এখান থেকে উদ্ধার করা এবং সাথে করে বাড়ী ফেরা অসম্ভব হয়ে পড়েছে তখন তারা ভীষণ উদ্বিগ্ন ও দুশ্চিন্তায় পড়ে গেল। তাদের মনে হতে লাগলো যে, তারা বাবার সাথে প্রতিজ্ঞা করে এসেছে যে, বেনইয়ামিনকে অবশ্যই সাথে করে নিয়ে আসবে এবং ইউসুফের ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবে না। এজন্য তারা মিশরের রাজার কাছে আবেদন করলো যে, বেনইয়ামিনের পরিবর্তে তাদের একজনকে আটক রেখে বেনইয়ামিনকে তার বাবার কাছে ফিরে যাবার অনুমতি দেয়া হোক। কিন্তু হযরত ইউসুফ তাদের আবেদন গ্রহণ করলেন না, তাদেরকে জানিয়ে দেয়া হল, মিশরের আইন অনুযায়ী একমাত্র দোষী ব্যক্তিকেই আটক রাখার নিয়ম অন্য কাউকে নয়।
অবশ্য হযরত ইউসুফ (আঃ) পুরো পরিকল্পনার কথা বেনইয়ামিনকে আগেই অবহিত করেছিলেন ,তাই এই ঘটনায় বেনইয়ামিন বিচলিত বা উদ্বিগ্ন হয় নি। এখানে একটি বিষয় লক্ষ্যনীয় হলো, বৈমাত্রেয় ভাইরা একদিন ইউসুফকে অপমানিত করার চেষ্টায় লিপ্ত ছিল এবং শেষ পর্যন্ত তাঁকে কূপে ফেলেছিল। কিন্তু আজ এই ভাইরা ইউসুফকে আজীজ বা 'মহামান্য রাজা' হিসেবে সম্বোধন করতে বাধ্য হলো। এটাই আল্লাহর ইচ্ছা, এটাই প্রকৃতিতে আল্লাহর বেঁধে দেয়া নিয়ম। এই নিয়মেই জালেমের পতন ঘটে এবং মজলুমের বিজয় নিশ্চিত হয়।
এবার ৮০ নম্বর আয়াতের অর্থ জানা যাক। এ আয়াতে বলা হয়েছে, " যখন তারা (বেনইয়ামিনের মুক্তির ব্যাপারে ) নিরাশ হয়ে গেল,তখন পরামর্শের জন্য একান্তে বসলো। তাদের জ্যেষ্ঠ ভাই বলল, তোমরা কি জানো না যে, পিতা তোমাদের কাছ থেকে আল্লাহর নামে অঙ্গীকার নিয়েছেন ? পূর্বে ইউসুফের ব্যাপারেও তোমরা অন্যায় করেছ। অতএব আমি কিছুতেই এদেশ ত্যাগ করবো না, যে পর্যন্ত পিতা আমাকে আদেশ না করেন অথবা আল্লাহ আমার পক্ষে কোন ব্যবস্থা না করে দেন। তিনিই সর্বোত্তম ব্যবস্থাপক। "
বেনইয়ামিনের মুক্তির ব্যাপারে নিরাশ হয়ে তারা যখন নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার ব্যাপারে মনস্থির করলো, তখন তাদের জ্যেষ্ঠ ভাই বাড়ী ফিরে যেতে রাজী হলো না। সে বলল, ইউসুফের ঘটনায় বাবা যথেষ্ট আঘাত পেয়েছেন, আমাদের অতীত কর্মকাণ্ড ভাল না। বেনইয়ামিনকে আমাদের সাথে ফেরৎ নেয়ার ব্যাপারে আমরা আল্লাহর নাম নিয়ে শপথ করেছি, কাজেই এ অবস্থায় আমি আর বাড়ী ফিরে যাব না,যতক্ষণ না বাবা বাড়ী ফেরার অনুমতি দেন বা আল্লাহর পক্ষ থেকে আমাদের অনুকূলে কিছু ঘটে। প্রতিশ্রুতি বা অঙ্গীকারের একটি প্রভাব রয়েছে, এই আয়াতে এটাই সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বেনইয়ামিনকে সাথে করে ফেরৎ নিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়ার কারণেই তার ভাইদের মনে একধরণের অপরাধবোধ তৈরী হয়েছিল।
এবার ৮১ ও ৮২ নম্বর আয়াতের দিকে নজর দেয়া যাক। এ দুটি আয়াতে বলা হয়েছে, "( ভাইরা বললো) তোমরা তোমাদের পিতার নিকট ফিরে যাও এবং বল, হে আমাদের পিতা ! তোমার পুত্র চুরি করেছে এবং আমরা যা জানি তারই প্রত্যক্ষ বিবরণ দিলাম, অদৃশ্যের ব্যাপারে আমরা কিছুই জানতাম না। ( আমাদের কথা বিশ্বাস না হলে ) যে জনপদে আমরা ছিলাম তার অধিবাসীদেরকে জিজ্ঞেস করুন এবং যে যাত্রীদলের সাথে আমরা এসেছি তাদেরও জিজ্ঞাসা করুন আমরা অবশ্যই সত্য বলছি। তাদের জ্যেষ্ঠ ভাই বললো যে, আমি মিশরেই থেকে যাই, হয়ত মিশরের রাজার মনে এতে সহানুভূতি তৈরী হবে এবং বেনইয়ামিনকে মুক্ত করে দেবে। আর তোমরা বাড়ী ফিরে যাও এবং বাবাকে যা প্রত্যক্ষ করেছো তারই বিবরণ দাও। গিয়ে বল, বেনইয়ামিন চুরির অপরাধে আটক হয়েছে। বাবা যদি বিশ্বাস করতে না চায় তাহলে অন্যান্য সহযাত্রীদের সাক্ষী হিসেবে উপস্থাপন কর এবং এটাও বল আমাদের বড় ভাই বেনইয়ামিনকে মুক্ত করার জন্য মিশরেই রয়ে গেছে। #
সূরা ইউসুফ : পর্ব-২৩
পাঠক! আজ আমরা সূরা ইউসুফের ৮৩ থেকে ৮৬ নম্বর আয়াতের সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা উপস্থাপন করবো। প্রথমেই এ দুটি আয়াতের অর্থ জানা যাক।
" ইয়াকুব বললো, না তোমরা এক মনগড়া কথা নিয়ে এসেছো। সুতরাং পূর্ণ ধৈর্য্যই শ্রেয়। হয়ত আল্লাহ তাদেরকে এক সঙ্গে আমার নিকট এনে দিবেন। তিনি সর্বজ্ঞ ও প্রজ্ঞাময়। পুত্রদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে সে বললো, আফসোস ইউসুফের জন্য! শোকে তার চক্ষুদ্বয় সাদা হয়ে গিয়েছিল এবং সে ছিল অসহনীয় মনস্তাপে ক্লিষ্ট। "
হযরত ইউসুফ (আঃ) এর বৈমাত্রেয় ভাইরা শেষ পর্যন্ত বেনইয়ামিনকে মিশরে রেখেই দেশে ফিরে গেল এবং বাহ্যত তারা যা দেখেছে, বুঝেছে সে অনুযায়ী বাবার কাছে সব ব্যক্ত করলো এবং এটা বুঝাবার চেষ্টা করলো যে, বেনইয়ামিন চুরির দায়ে অভিযুক্ত হয়েই মিশরে আটক রয়েছে। গত পর্বে এ পর্যন্ত আলোচনা হয়েছে। ৮৩ ও ৮৪ নং আয়াতে বলা হচ্ছে, হযরত ইয়াকুব (আঃ) পুত্রদের বক্তব্য শোনার পর বললেন, মনে হচ্ছে তোমাদের কুপ্রবৃত্তি আরেকটি নোংরা কর্মকে তোমাদের চোখের সামনে সুন্দররূপে তুলে ধরেছে। ইউসুফকে হারিয়ে আমার যে মর্মজ্বালা, বেনইয়ামিনকে মিশরে রেখে তোমরা তা আরও বাড়াতে চাও। কিন্তু আমি অসহিষ্ণু হতে চাই না। আমি ধৈর্য্য ধরবো। আশা করি মহান আল্লাহ তাদের দুজনকেই আমার কাছে এনে দিবেন। তবে হযরত ইয়াকুব (আঃ) ধৈর্য্য ধারণ করলেও তিনি ভীষণ মানসিক কষ্টে দিনযাপন করছিলেন। মনস্তাপ ও চোখের পানিতে তার চোখ সাদা হয়ে গিয়েছিল এবং দৃষ্টিশক্তি তিনি হারিয়ে ফেলেছিলেন।
বেনইয়ামিনের ক্ষেত্রে তার বৈমাত্রেয় ভাইদের কোন অশুভ ইচ্ছা বা পরিকল্পনা ছিল না। এক্ষেত্রে তাদেরকে দোষীও সাব্যস্ত করা যাবে না। কিন্তু হযরত ইউসুফের সাথে তারা যে আচরণ করেছে, হযরত ইয়াকুব তা কখনোই ভুলতে পারেন নি। এজন্য তিনি এবারও পুত্রদের কথা বিশ্বাস করতে পারেন নি । তিনি তাদেরকে ভর্ৎসনা করলেন এবং আল্লাহর উপর নির্ভর করে ধৈর্য্য ধারণ করার সিদ্ধান্ত নিলেন।
এবার ৮৫ নং আয়াতের দিকে নজর দিচ্ছি। এ আয়াতে বলা হয়েছে, " তারা বলল, আল্লাহর শপথ! আপনি তো ইউসুফের কথা ভুলবেন না-যতক্ষণ না আপনি মুমূর্ষ অবস্থায় পতিত হবেন বা মৃত্যুবরণ করবেন।"
বেনইয়ামিনকে মিশরে আটক করার ঘটনা হযরত ইয়াকুব (আঃ) এর মনে ইউসুফকে হারানোর কষ্ট আরো বাড়িয়ে দেয়। তাই তিনি ঘন ঘন ইউসুফের কথা মনে করতে লাগলেন-যেটা তার পুত্রদের মোটেও ভালো লাগছিলো না। কারণ তারা ইউসুফকে ভীষণ হিংসা করতো। এজন্য তারা তাদের পিতাকে বললো, ইউসুফের দুঃখে আপনি নিজেকেই ধ্বংস করে ফেলছেন। ইউসুফকে বাঘে খেয়ে ফেলেছে, আমরা তা স্বচক্ষে দেখেছি। কাজেই ইউসুফের কথা মনে করে কেন আপনি নিজের ক্ষতি করছেন।
হযরত ইয়াকুব (আঃ) আল্লাহর নবী হিসেবে ইউসুফকে ভালো করেই চিনতেন। তার ভবিষ্যৎ তিনি উপলব্ধি করতেন। কিন্তু ইউসুফের প্রতি পিতার ভালোবাসার কারণ তার বৈমাত্রেয় ভাইরা উপলব্ধি করতে সক্ষম ছিল না। তাই তারা ইউসুফের প্রতি ঈর্ষাপরায়ণ ছিল এবং তাকে পথে কাঁটা হিসেবে বিবেচনা করতো।
এরপর ৮৬ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, " ইয়াকুব বলল, আমি আমার অসহনীয় বেদনা, আমার দুঃখ শুধু আল্লাহর নিকট নিবেদন করছি এবং আমি আল্লাহর নিকট থেকে যা জানি তোমরা তা জান না। "
পবিত্র কোরআনের অন্যান্য আয়াত থেকে এটা সুস্পষ্ট যে, নবী-রাসূলগণ যে কোন সমস্যা ও বিপদে আল্লাহর উপর নির্ভর করতেন, তার সাহায্য কামনা করতেন, সব কিছু আল্লাহর কাছেই নিবেদন করতেন। যেমন-হযরত মুসা (আঃ) অভাব অনটনের কথা আল্লাহর কাছে অভিযোগ করেছিলেন। হযরত ইয়াকুব (আঃ) রোগ মুক্তির আবেদন করেছিলেন। হযরত ইয়াকুব (আঃ)ও তেমনি অত্যধিক স্নেহভাজন শিশু পুত্রকে হারানোর বিষয়টি আল্লাহর উপরই সোপর্দ করেছিলেন।
সূরা ইউসুফ : পর্ব ২৪
পাঠক! আজকের আসরে সূরা ইউসুফের ৮৭ থেকে ৮৯ নম্বর আয়াতের অনুবাদ ও সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা উপস্থাপন করা হবে। ৮৭ নং আয়াতে বলা হয়েছে, "হে আমার পুত্রগণ, তোমরা যাও, ইউসুফ ও তার সহোদরের অনুসন্ধান কর এবং আল্লাহর রহমত হতে তোমরা নিরাশ হয়ো না। কারণ অবিশ্বাসী সম্প্রদায় ব্যতীত আল্লাহর রহমত বা আশিস হতে কেউ নিরাশ হয় না। "
গত পর্বে আলোচনা হয়েছে যে, বেনইয়ামিনকে মিশরে আটক রাখার খবর যখন হযরত ইয়াকুব (আঃ) কে জানানো হল, তখন ইউসুফের ঘটনা তাঁর মনে পড়ে গেলে। ফলে দুঃখ ভারাক্রান্ত মনে তিনি আল্লাহর দরবারে ফরিয়াদ করলেন এবং এই পরিস্থিতি থেকে উদ্ধার পাওয়ার জন্য আল্লাহর সাহায্য কামনা করলেন।
বাল্যকালে দেখা হযরত ইউসুফের তাৎপর্যপূর্ণ স্বপ্নের কথা ইয়াকুব (আঃ) এর মনে ছিল। তাই তিনি নিশ্চিত ছিলেন, ইউসুফ মারা যায় নি বরং স্বপ্নের কারণে তিনি বিশ্বাস করতেন যে, আল্লাহ ইউসুফকে এই পৃথিবীতেই একজন সম্মানী ও প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করবেন। এজন্য তিনি পুত্রদেরকে নির্দেশ দিলেন যে, তোমরা পুনরায় মিশরে যাও এবং সেখানে ইউসুফকে অনুসন্ধান কর। পাশাপাশি বেনইয়ামিনের মুক্তির জন্য চেষ্টা কর। এরপর দুজনকে নিয়ে তোমরা আবার আমার কাছে ফিরে এসো। তিনি পুত্রদেরকে এ কাজে উৎসাহিত করার জন্য আল্লাহর অফুরন্ত নেয়ামত ও রহমতের কথা স্মরণ করিয়ে দিলেন এবং বললেন, আল্লাহর রহমতের ব্যাপারে কখনও হতাশ হতে নেই। কারণ হতাশা বা নিরাশা কুফরের নিদর্শন।
আল্লাহর আশিস বা রহমতের ব্যাপারে নিরাশ হতে নেই। নবী-রাসূল এবং অলী আউলিয়াগণ সব সময় মানুষকে আল্লাহর রহমতের ব্যাপারে আশাবাদী করতেন। পথভ্রষ্ট কাফের মুশরেকরাই মানুষকে হতাশায় নিমজ্জিত করে। তাই যে কোন কাজের ব্যাপারে মানুষকে উদ্যোগী হতে হবে, তার কর্ম ও চেষ্টা থাকতে হবে। তাহলেই আল্লাহর বিশেষ সাহায্য তার কাজকে সহজ করতে সহায়ক হবে।
এবার দেখা যাক পরের আয়াতে কি বলা হয়েছে- " তারা যখন ইউসুফের নিকট উপস্থিত হলো, তখন বললো, হে আজিজ! আমরা ও আমাদের পরিবার-পরিজন বিপন্ন হয়ে পড়েছি এবং আমরা (গম ক্রয়ের জন্য) সামান্য মূল্য সঙ্গে এনেছি। আপনি আমাদের রসদ পূর্ণমাত্রায় দিন এবং আমাদেরকে কৃপা করুন। নিশ্চয়ই আল্লাহ দাতাগণকে পুরস্কৃত করে থাকেন। "
তৃতীয়বার যখন তারা মিশরে গেল, তখন তারা অত্যন্ত অনুনয়-বিনয় করে হযরত ইউসুফকে বলল, আমরা দুর্ভিক্ষের কারণে ভীষনভাবে বিপন্ন হয়ে পড়েছি। এজন্য খাদ্য বা রসদ কেনার জন্য পর্যাপ্ত অর্থ সংগ্রহ করা আমাদের পক্ষে সম্ভব হয়নি। তারা আবদার করলো, প্রথমবার যেমন তাদের পূর্ণ অর্থ ফেরৎ দেয়া হয়েছিল এবার যেন অনুগ্রহ করে অর্ধেক মূল্য মাফ করে দেয়া হয়।
অভাব এবং দারিদ্র্যের কারণে অনেক সময় মানুষের দম্ভ ও অহংকার চূর্ণ হয়ে যায়। হযরত ইউসুফের বৈমাত্রেয় ভাইদের এক সময় খুব অহংকার ছিল। তারা দম্ভভরে বলতো, আমরা অত্যন্ত শক্তিশালী ও সামর্থবান। বাবা আমাদেরকে গুরুত্ব না দিয়ে ভুল করছেন। কিন্তু দেখা গেল, এক সময় এই ভাইরা অভাবের তাড়নায় অর্ধেক মূল্যে খাদ্য পাওয়ার জন্য অনুনয়-বিনয় করতে বাধ্য হচ্ছে।
এবার ৮৯ নম্বর আয়াতের দিকে নজর দেয়া যাক। এই আয়াতে বলা হয়েছে, " ইউসুফ বলল, তোমরা কি জান ইউসুফ ও তার সহোদরের প্রতি তোমরা কিরূপ আচরণ করেছিলে, যখন তোমরা ছিলে অপরিনামদর্শী। "
ভাইদের অনুনয়-বিনয় এবং দুরবস্থা দেখে হযরত ইউসুফের মন আবেগে উদ্বেগ হয়ে উঠল। তিনি আর পারলেন না নিজের পরিচয় গোপন রাখতে। তাই তিনি এক রহস্যময় প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে ভাইদেরকে চমকে দিলেন। তিনি এভাবে বললেন না যে, আমি ইউসুফ আর তোমরা আমার সাথে কি অন্যায় করেছিলে বরং তিনি বললেন, তোমাদের কি মনে আছে যে, অজ্ঞতা ও অপরিনামদর্শীতার কারণে তোমরা তোমাদের ভাই ইউসুফ ও তার সহোদরের সাথে কি আচরণ করেছো ? তিনি এই প্রশ্নের মাধ্যমে এটাই বুঝাতে চাইলেন যে, তাদের সকল অপকর্মের ব্যাপারে তিনি ওয়াকিবহাল। কাজেই এই অভাব বা দুরবস্থার মধ্যে তারা যদি তাদের অপরাধের জন্য ক্ষমাপ্রার্থী হয় তাহলে আল্লাহর দরবারে বিনত মস্তকে তাদের তাওবা করা উচিত। এজন্য তিনি তাদের প্রতি অত্যন্ত সদয় ব্যবহার করলেন। বুঝাতে চাইলে, যা করেছো, তাতে তোমাদের তেমন হাত ছিল না। অজ্ঞতা এবং শয়তানের কুপ্ররোচনায় তোমরা সেদিন ভুল করেছিলে।
হযরত ইউসুফ (আঃ) মিশরের অত্যন্ত ক্ষমতাধর ব্যক্তি হওয়া সত্ত্বেও ভাইদের নিষ্ঠুর আচরণের প্রতিশোধ গ্রহণের চিন্তাই করলেন না। বরং তিনি অত্যন্ত বিনীতভাবে বৈমাত্রেয় ভাইদের অভাব অনটন এবং পরকালীন মুক্তির পথ প্রশস্ত করার উদ্যোগ নিলেন। তাদেরকে অনুগ্রহ করলেন এবং তাদেরকে ক্ষমা করে দিলেন। এটাই ইসলামের শিক্ষা। এটাই নবী-রাসূলদের আদর্শ। মানুষের অসহায়ত্বের সুযোগ কখনো নিতে হয় না। #
সুরা ইউসুফ : পর্ব ২৫
কোরআনের আলোর আজকের আসরে আমরা সূরা ইউসুফের ৯০ থেকে ৯২ নম্বর আয়াতের অনুবাদ ও সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা উপস্থাপন করবো । ৯০ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, অর্থাৎ "তারা বলল, তবে কি তুমিই ইউসুফ ? সে বলল, আমিই ইউসুফ এবং সে আমার সহোদর ভাই । আল্লাহ আমাদের প্রতি অনুগ্রহ করেছেন । যে ব্যক্তি সাবধানী এবং ধৈর্য্যশীল সেই সৎকর্ম পরায়ন এবং আল্লাহ অবশ্যই সৎকর্মশীলদের শ্রমফল নষ্ট করেন না।"
হযরত ইউসুফ (আ:) বৈমাত্রেয় ভাইদের করুণ অবস্থা দেখে নিজেকে আর সামলে উঠতে পারলেন না । তাই তিনি নিজের পরিচয় প্রকাশ করার জন্য নানাভাবে ইঙ্গিতে কথা বলতে লাগলেন । তিনি প্রশ্ন করলেন, তোমরা ইউসুফ ও তার ভাইদের ঘটনা সম্পর্কে কি জান ? এ কথা শুনে ভাইরা আঁতকে উঠলো। তারা ভাবতে লাগল মিশরের বাদশা বা আজীজে মিশর আবার কি করে ইউসুফের ঘটনা সম্পর্কে জানলো ! তাহলে কি এই সুদর্শন যুবকই ইউসুফ !
বৈমাত্রেয় ভাইদের কাছে এভাবে হযরত ইউসুফের পরিচয় প্রকাশ হয়ে গেল, তারা হযরত ইউসুফের ক্ষমতা ও প্রতিপত্তির কারণে বিষ্মিত ও শংকিত হয়ে পড়লো । হযরত ইউসুফ (আ:) তাদেরকে বোঝালেন, সবই আল্লাহর ইচ্ছা, তিনিই তাকে ও তার সহোদরকে এই মর্যাদায় ভূষিত করেছেন এবং সকলকে পুনরায় একত্রিত হওয়ার ব্যবস্থা করেছেন ।
হযরত ইউসুফ (আ:) এর এই ঘটনা থেকে প্রতিয়মান হয় যে, সত্যের জয় এবং মিথ্যার পরাজয় অনিবার্য । সময়ের সাথে সাথে সত্য প্রকাশিত হবেই ।
এবার এই সূরার ৯১ ও ৯২ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করা যাক । এই দুই আয়াতে বলা হয়েছে, অর্থাৎ "তারা বলল, আল্লাহর শপথ, আল্লাহ নিশ্চয়ই তোমাকে আমাদের উপর প্রাধান্য দিয়েছেন এবং আমরা নিশ্চয়ই অপরাধী ছিলাম । (ইউসুফ) বলল, আজ তোমাদের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ নেই আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করুন এবং তিনি দয়ালুদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ দয়ালু।"
হযরত ইউসুফ(আ:) এর সৌহার্দপূর্ণ বক্তব্য শুনে বৈমাত্রেয় ভাইরা যারপরনাই লজ্জিত হলো । তখন তাদের মনে যতই ইউসুফের প্রতি অন্যায় আচরণের কথা মনে হচ্ছিল ততই তারা লজ্জিত ও আতঙ্কগ্রস্ত হচ্ছিল । আবার ব্যথাভরা আনন্দে তারা উদ্বেলিত হচ্ছিল । হযরত ইউসুফ তাদেরকে জাড়িয়ে ধরলেন, আলিঙ্গন করলেন এবং সৎকর্মপরায়নদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহের কথা তাদেরকে স্মরণ করিয়ে দিলেন ।
হযরত ইউসুফ (আ:) এর বিনম্র ব্যবহারে তার বৈমাত্রেয় ভাইরা বিষ্মিত হলো, তারা তাদের অপরাধ স্বীকার করে বলতে লাগলো, আমরা অন্যায়ভাবে তোমাকে হিংসা করেছি। তুমি নিশ্চয়ই আমাদের চেয়ে বেশী শ্রেষ্ঠ । তোমার মর্যাদা আমাদের চেয়ে অনেক উর্ধ্বে । হযরত ইউসুফ (আ:) আবারও বললেন, যা অতীত হয়েছে তা নিয়ে ভাবা উচিত নয় । নিশ্চয়ই আল্লাহ তা ক্ষমা করে দিবেন । এখন অভিযোগ বা তিরস্কার করার সময় নয় । আল্লাহ আমাদেরকে পুনরায় একত্রিত হওয়ার ব্যবস্থা করেছেন । এ জন্য আমাদের কৃতজ্ঞ হওয়া উচিত ।
এটাই নবী-রাসুলদের শিক্ষা । মক্কা বিজয়ের পর সহাবীদের যারা প্রতিশোধ নেয়ার জন্য উদ্যত হয়েছিলেন, নবী করিম(সা:) তাদেরকে এ থেকে নিবৃত্ত করেন । নবী করিম (সা:) মক্কা বিজয়ের দিনকে শান্তি ও রহমতের দিন আখ্যায়িত করে সকলকে ক্ষমা করে দিয়েছিলেন । তিনি বলেছিলেন, আজকের দিনে আমি তাই করবো যা আমার ভাই হযরত ইউসুফ(আ:) তার বৈমাত্রেয় ভাইদের সাথে করেছিলেন। বর্ণনায় এসেছে, ক্ষমতাবান হওয়ার পর অত্যাচারী শত্রুকে ক্ষমা করে দেয়া আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনের নিদর্শন । #
সূরা ইউসুফ : পর্ব-২৬
পাঠক! আজকের আসরে সূরা ইউসুফের ৯৩ থেকে ৯৫ আয়াতের অনুবাদ ও সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা উপস্থাপন করা হবে। শুরুতেই আমরা দেখবো ৯৩ নম্বর আয়াতে কি বলা হয়েছে।
" তোমরা আমার এ জামাটি নিয়ে যাও এবং তা আমার পিতার মুখমণ্ডলের উপর রেখো, তিনি দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাবেন। এরপর তোমাদের পরিবারের সকলকেই আমার নিকট নিয়ে এসো। "
গত আসরে আলোচনা করা হয়েছে যে, বৈমাত্রেয় ভাইরা হযরত ইউসুফ (আঃ) কে চিনতে পেরে তাদের কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে। হযরত ইউসুফ (আঃ) এবার প্রতিশোধ নিতে পারে এই আশংকায় তারা ভীষণভাবে সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। কিন্তু হযরত ইউসুফ (আঃ) অত্যন্ত বিনম্রভাবে তাদের সাথে আচরণ করলেন , তাদেরকে আলিঙ্গন করলেন এবং তাদের পাপ মুক্তির জন্য আল্লাহর দরবারে দোয়া করলেন।
হযরত ইউসুফের এমন আচরণে তারা বিমুগ্ধ এবং আশ্বস্ত হলো। এরপর তারা পিতার অবস্থা সম্পর্কে খুলে বললো। পিতা দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন এটা শোনার পর হযরত ইউসুফ নিজের একটি জামা দিয়ে বললেন, এটা বাবার চোখের উপর রাখলে তিনি দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাবেন। এরপর পরিবারের সকলকে নিয়ে আসার জন্য তিনি ভাইদেরকে পাঠিয়ে দেন।
এখানে একটি লক্ষণীয় বিষয় হলো, হযরত ইয়াকুব (আঃ) নিজেও আল্লাহর নবী ছিলেন, সুস্থতার জন্য তার দোয়াই যথেষ্ট হতো কিন্তু এক্ষেত্রে তিনি হযরত ইউসুফ (আঃ) এর জামার স্পর্শে আরোগ্য লাভ করলেন। এ থেকে বোঝা যায় যে, নবী-রাসূল এবং ওলী-আওলিয়ারা নিজেরা নিজেরা যেমন মানুষের জন্য কল্যাণকর, তেমনি তাদের ব্যবহৃত জিনিসপত্রও কল্যাণ ও মঙ্গল বয়ে আনতে পারে। কাজেই ওলি-আওলিয়াদের ব্যবহৃত কোন জিনিস তাবার্রুক হিসেবে গ্রহণ করা অবৈধ কিছু নয়।
এবার দেখা যাক ৯৪ ও ৯৫ নম্বর আয়াতে কি বলা হয়েছে।
" অতঃপর যাত্রীদল যখন ( মিশর থেকে ) বেরিয়ে পড়ল তখন তাদের পিতা বলল, তোমরা যদি আমাকে অপ্রকৃতিস্থ মনে না কর, তবে আমি বলব যে, আমি ইউসুফের ঘ্রাণ পাচ্ছি। উপস্থিত ব্যক্তিগণ বলল, আল্লাহর শপথ! আপনি তো আপনার পূর্ব বিভ্রান্তিতেই রয়েছেন। "
পিতা-পুত্রের মধ্যে আত্মিক সম্পর্ক এতো শক্তিশালী ছিল যে, হযরত ইউসুফের ভাইরা যখন তার পরিধানের জামা সাথে নিয়ে মিশর ত্যাগ করলো,তখন সিরিয়ার কেনানে বসে হযরত ইয়াকুব ( আঃ) পরিবারের লোকজনকে উদ্দেশ্য করে বলতে লাগলেন, তোমরা যদি আমাকে অপ্রকৃতিস্থ মনে না কর তাহলে আমি নিশ্চিত করে বলবো যে, আমি ইউসুফের ঘ্রাণ পাচ্ছি। স্বাভাবিকভাবেই লোকজন বলল, ইউসুফের মৃত্যুর এত বছর পর তার বেঁচে থাকার আশা করা বা তার ঘ্রাণ অনুভব করা স্বপ্ন ছাড়া আর কিছু নয়।
এখানে একটি প্রশ্ন আসতে পারে যে, হযরত ইউসুফকে যখন কুপে ফেলে দেয়া হয় কিংবা যখন তাকে কারাগারে পাঠানো হয়,তখন হযরত ইয়াকুব (আঃ) এর মনে এমন অনুভূতি কেন আসেনি ?
এর জবাব হচ্ছে যে, কারো মনে অনুভূতি জাগ্রত হওয়া বা অদৃশ্য ইঙ্গিতে জ্ঞান লাভ করা এসবই হয়ে থাকে আল্লাহর ইচ্ছায়। এছাড়া এ ঘটনার পেছনে ঐশি উদ্দেশ্য ছিল হযরত ইউসুফ (আঃ) কঠিন বাস্তবতার মুখে অভিজ্ঞতা অর্জন করবেন,মিশরের মতো একটি সুসভ্য দেশ পরিচালনার জন্য নিজেকে যোগ্য করে তুলবেন। পাশাপাশি আল্লাহর ইচ্ছা ছিল, হযরত ইয়াকুব (আঃ) কে ধৈর্যের কঠিন পরীক্ষায় অবতীর্ণ করা। #
সূরা ইউসুফ : পর্ব-২৭
পাঠক! আজকের আসরে আমরা সূরা ইউসুফের ৯৬ থেকে ৯৯ আয়াতের অনুবাদসহ সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা উপস্থাপন করবো। এই সূরার ৯৬ নং আয়াতে বলা হয়েছে, " অতঃপর যখন সুসংবাদবাহক উপস্থিত হল এবং তার মুখমণ্ডলের উপর জামাটি রাখল তখন সে দৃষ্টিশক্তি ফিরে পেল । সে বলল, আমি কি তোমাদের বলিনি যে, আমি আল্লাহর নিকট থেকে যা জানি তোমরা তা জান না ? "
গত পর্বে বলা হয়েছে, হযরত ইউসুফ ( আ ) তার একটি জামা ভাইদের হাতে দিয়ে বলেছিলেন এটি দিয়ে বাবার মুখ মুছে দিলে তার চোখ ভালো হয়ে যাবে এবং তিনি দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাবেন । এই আয়াতে বলা হচ্ছে, যখন তারা বাড়ীতে ফিরে এসে হযরত ইউসুফের জামাটি তাদের বাবার চেখের উপর রাখলো সাথে সাথে তিনি অলৌকিকভাবে দৃষ্টিশক্তি ফিরে পেলেন । এরপর হযরত ইয়াকুব (আ ) তার ছেলেদেরকে উদ্দেশ্য করে বললেন , যখনই আমি ইউসুফের কথা বলেছি তখনি তোমরা উপহাস করে আমাকে বলেছ যে, বাবার ভীমরথী হয়েছে , কারণ বাবা যার অপেক্ষায় দিন গুনছে সে বহু বছর আগেই বাঘের পেটে চলে গেছে । কিন্তু তোমরা বুঝতে পার নাই আল্লাহর পক্ষ থেকে আমি যা জানি তোমরা তা জান না । এছাড়া ঐশি ইঙ্গিতেই আমি এ ব্যাপারে আশায় বুক বেঁধে ছিলাম
এখানে লক্ষ্য করার মত বিষয় হচ্ছে হযরত ইয়াকুব ( আ ) এর এই ছেলেরাই একদিন রক্তমাখা জামা এনে বলেছিল ইউসুফকে বাঘে খেয়ে ফেলেছে , আজ তারাই আবার হযরত ইউসুফের জামা এনে সুসংবাদ দিচ্ছে যে, তিনি শুধু বেঁচে আছেন তাই নয় , তিনি এখন মিশরের অত্যন্ত পরাক্রমশালী ব্যক্তিত্ব । আসলে আল্লাহর ইছ্ছার উপর কারো হাত নেই।
এই আয়াতে লক্ষ্যণীয় বিষয় হচ্ছে, সুসন্তান বাবা মার জন্য মানসিক শান্তি বয়ে আনে আর সন্তান যদি ভালো না হয় তাহলে বাবা মার অশান্তির আর সীমা থাকে না।
এছাড়া ঐশি প্রতিশ্রুতির ব্যাপারে নবী রাসুলরা যে কতটুকু আস্থাশীল তা এ ঘটনায় তা ফুটে উঠেছে ।
এই সূরার ৯৭ ও ৯৮ নং আয়াতে আল্লাহতালা বলেছেন, "( পুত্ররা বললো ) হে আমাদের পিতা! আমাদের পাপের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন , আমরা অবশ্যই অপরাধী ।
তিনি বললেন, আমি আমার প্রতিপালকের নিকট তোমাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করব, নিশ্চয়ই তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু ।"
ঐ ঘটনার পর হযরত ইউসুফের বৈমাত্রেয় ভাইরা প্রকৃতপক্ষেই অনুতপ্ত হয়েছিল , তাদের পিতা হযরত ইয়াকুব (আ)ও একজন আল্লাহর নবী ছিলেন, তাই তারা পাপের ক্ষমা লাভের জন্য দোয়া করতে হযরত ইয়কুব ( আ )কে বারবার অনুরোধ করতে লাগল, হযরত ইয়াকুব (আ)ও তাদেরকে আশ্বাস দিলেন যে উপযুক্ত সময়ে তিনি তাদের ক্ষমার আবেদন জানিয়ে আল্লাহর কাছে দোয়া করবেন।
হাদীস শরীফে বর্ণীত হয়েছে যে , উপযুক্ত সময় বলতে হযরত ইয়াকুব (আ) বৃহস্পতিবা দিবাগত রাতকে বুঝিয়েছেন । কারণ এই রাতে সাধারণত আল্লাহর দরবারে দোয়া কবুল হয় ।
এখানে লক্ষ্যণীয় বিষয় হচ্ছে আল্লাহর অনুগ্রহ লাভের জন্য বা ক্ষমা লাভের জন্য ওলী আওলীয়াদেরকে উসিলা হিসেবে গ্রহণ করা হলে তাতে দোষের কিছু নেই । এ ঘটনায় আমাদের আরেকটি শিক্ষনীয় বিষয় হচ্ছে কেউ যদি নিজ ভুল স্বীকার করে নেয় তাহলে তাকে আর তিরস্কার না করে ক্ষমা করে দেয়া উচিত ।
এবার ৯৯ নং আয়াতের দিকে দৃষ্টি দিচ্ছি। এই আয়াতে বলা হয়েছে, " অতঃপর ইউসুফের পরিবার যখন তার কাছে পৌঁছল তখন সে তার পিতা মাতাকে নিজের কাছে স্থান দিলেন এবং বললেন, আপনারা আল্লাহর ইচ্ছায় নিরাপদে মিশরে প্রবেশ করুন। "
দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর পিতা পুত্রের মধ্যে সাক্ষাৎ - সেই অনুভুতি কোন ভাষায় ব্যক্ত করা সম্ভব নয় । হযরত ইউসুফ তার বাবা এবং পরিবারের অন্যান্য সদস্যদেরকে স্বাগত জানানোর জন্য শহরের বাইরে গিয়ে অপেক্ষা করতে লাগলেন ।
পবিত্র কোরআন শধু ঐ ঘটনার সামান্য ইঙ্গিত দিয়ে বলেছে, হযরত ইউসুফ অত্যন্ত সম্মানের সাথে তার পরিবার পরিজনকে মিশরে বরণ করে নেন । #
সূরা ইউসুফ : পর্ব-২৮
পাঠক! আপনাদের নিশ্চয়ই মনে আছে যে সূরা ইউসুফের উপর আমাদের আলোচনা চলছে। আজকের আসরে এই সূরার ১০০ ও ১০১ আয়াতের অনুবাদ ও সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা উপস্থাপন করা হবে। তো দেখা যাক ১০০নং আয়াতে কি বলা হয়েছে,
" ইউসুফ তার পিতা-মাতাকে উচ্চাসনে বসাল এবং তারা সকলে তার প্রতি সেজদায় লুটিয়ে পড়ল। সে বলল, হে আমার পিতা ! এটিই আমার পূর্বেকার স্বপ্নের ব্যাখ্যা, আমার প্রতিপালক তা সত্যে পরিণত করেছেন। তিনি আমাকে কারাগার থেকে মুক্ত করে এবং শয়তান আমার ও আমার ভাইদের সম্পর্ক নষ্ট করার পরও আপনাদেরকে মরু অঞ্চল থেকে এখানে এনে দিয়ে আমার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন। আমার প্রতিপালক যা ইচ্ছা তা নিপুণতার সাথে করেন । নিশ্চয়ই তিনি সর্বজ্ঞ ও প্রজ্ঞাময়। "
হযরত ইউসুফ (আঃ) যখন জানতে পারলেন তার পরিবার মিসরের কাছাকাছি পৌঁছে গেছেন তখন তিনি তাদেরকে স্বাগত জানানোর জন্য শহরের বাইরে অপেক্ষা করতে লাগলেন। কাফেলা পৌঁছামাত্রই তিনি পিতাকে জড়িয়ে ধরে আলিঙ্গন করলেন। এই আয়াতে বাবা মা'র সাথে হযরত ইউসুফের আচরণ সম্পর্কে বলা হয়েছে, হযরত ইউসুফ তার বাবা মা'কে প্রাসাদের ভিতরে নিয়ে গেলেন এবং তাদেরকে সিংহাসনে বসালেন, এবং সম্মান প্রদর্শন করলেন। কিন্তু তার বাবা মা এবং ভাইরা সকলেই ইউসুফকে ফিরে পাওয়ার আনন্দে আল্লাহর দরবারে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনের জন্য সিজদায় অবনত হলেন,তারা বারবার বিষ্মিত হচ্ছিল ইউসুফ শুধু জীবিতই নয় সে এখন একজন অত্যন্ত ক্ষমতাধর ব্যক্তি। তাই তারা সকলেই আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করলেন। তবে তারা যখন সিজদায় অবনত মস্তকে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল তখন হযরত ইউসুফ তাদের সামনেই দন্ডায়মান ছিলেন, এজন্য সিজদা থেকে উঠার পর তিনি তার পিতাকে বললেন, বাল্যকালে আমি স্বপ্ন দেখেছিলাম চন্দ্র সূর্য ও এগার নক্ষত্র আমাকে সিজদা করছে, আজ আমার সেই স্বপ্নই যেন বাস্তবায়িত হল। চন্দ্র সূর্য হল আমার বাবা ও মা আর এগার নক্ষত্র হল আমার এগার ভাই। হযরত ইউসুফ মিশরে তার ঘটনাবহুল জীবণের সব কিছু পরিবারের সবাইকে খুলে বললেন, কিভাবে কোন পরিস্থিতিতে তিনি কারাগারে যেতে বাধ্য হলেন. কিভাবে আবার মুক্তি পেলেন, সব ঘটনাই তিনি বর্ণনা করলেন, এসব কিছুকে তিনি আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ বলে মন্তব্য করলেন । কিন্তু তিনি বৈমাত্রেয় ভাইদের দ্বারা কিভাবে কূয়ায় নিক্ষিপ্ত হয়েছিলেন এবং কৃতদাসে পরিণত হয়ে কিভাবে তিনি মিশরে এসেছিলেন সে প্রসঙ্গে তিনি কিছুই বললেন না। কারণ এসব বলে তিনি ভাইদেরকে লজ্জিত করতে চান নি। বরং তিনি ভাইদের অন্যায় আচরণকে শয়তানের কুপ্ররোচনার ফল বলে উল্লেখ করলেন । তিনি বললেন, শয়তানই ভাইদের মনে বিদ্বেষের আগুন জ্বালিয়ে ঐ অপকর্ম করতে বাধ্য করেছিল।
এই ঘটনায় লক্ষ্য করার মত বিষয় হচ্ছে , অন্যায় আচরণকারীর প্রতি বিদ্বেষ লালন না করে তাকে ক্ষমা করতে পারাটা হচ্ছে মহত্বের রক্ষণ। হযরত ইউসুফ (আ) তার ভাইদের অমার্জনীয় অপরাধ ক্ষমা করে দিয়ে মহানুভবতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। এখানে হযরত ইউসুফ (আ ) এর আচরণে পিতা মাতার সাথে কেমন ব্যবহার করা উচিত তারও বাস্তব দৃষ্টান্ত ফুটে ওঠেছে । মানুষ যত বড় বা ক্ষমতাবানই হোক না কেন পিতা মাতার কাছে সে সব সময়ই একজন সন্তানতুল্য। তাই পিতা মাতাকে সর্বোচ্চ সম্মান সম্মান দেয়ার বিষয়টি সর্বাবস্থায় মনে রাখতে হবে।
এবার ১০১ নং আয়াতের দিকে নজর দিচ্ছি, দেখা যাক এই আয়াতে কি বলা হয়েছে-
" হে আমার প্রতিপালক ! তুমি আমাকে রাজ্য দান করেছ এবং স্বপ্নের ব্যাখ্যা শিক্ষা দিয়েছ। হে আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর স্রষ্টা ! তুমিই ইহলোক ও পরলোকে আমার অভিভাবক। তুমি আমাকে মুসলমান বা আত্মসমর্পণকারীর মৃত্যু দাও এবং আমাকে সৎকর্মপরায়নদের অন্তর্ভুক্ত কর। "
পবিত্র কোরআনে প্রাচীন মিশরের দুইজন শাসকের বর্ণনা পাওয়া যায়। এদের একজন হলো ফেরাউন এবং অপর জন হলেন হযরত ইউসুফ (আ)। ফেরাউন ছিল ঔদ্ধত্য ও অত্যাচারী। জনগণকে সে দাস হিসেবে বিবেচনা করত। সে মনে করত ক্ষমতার উৎস সে নিজেই। অপর দিকে হযরত ইউসুফ (আ) ছিলেন সম্পূর্ণ তাঁর বিপরীত। ক্ষমতাকে তিনি আল্লাহর দেয়া আমানত হিসেবে বিবেচনা করতেন। তিনি বলতেন, হে আল্লাহ. আমার যা কিছু সম্বল তার সবটুকুই তোমার। জ্ঞান, প্রজ্ঞা এবং ক্ষমতার যতটুকু অধিকারী হতে পেরেছি তা তোমারই অনুগ্রহে সম্ভব হয়েছে। শুধু ইহকালেই নয় পরকালেও আমরা তোমার উপরই নির্ভরশীল। হে আল্লাহ ! আমি যেন তোমার অনুগত থেকেই মৃত্যুবরণ করি। আমাকে তুমি তোমার একান্ত অনুগত ও সৎকর্মশীলদের অন্তর্ভুক্ত করে নাও।
হযরত ইউসুফ (আ) এভাবে স্ববিনয়ে আল্লাহর কছে দোয়া করতেন। তিনি প্রকৃতই একজন আত্মসমর্পণকারী ছিলেন। ক্ষমতার সর্বোচ্চ শিখরে পৌছার পরও তিনি এক মুহুর্তের জন্য আল্লাহর অনুগ্রহের কথা ভুলেন নি।
ক্ষমতা এবং সম্পদ মানুষকে আল্লাহর পথ থেকে সরিয়ে নেয়। এই দুই ক্ষেত্রে মানুষের জীবণে অনেক উত্থান পতন আসে। তাই সব সময় আল্লাহর স্মরণাপন্ন হওয়া উচিৎ, তিনিই যে কোন বিপদ থেকে মানুষকে রক্ষা করতে পারে।
সূরা ইউসুফ : পর্ব-২৯
পাঠক! আজ আমরা সূরার ১০২ থেকে ১০৬ আয়াতের অনুবাদ ও সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা উপস্থাপন করব।
প্রথমেই দেখা যাক ১০২ নং আয়াতে কি বলা হয়েছে, "এ সব অদৃশ্যলোকের সংবাদ-যা আমি ঐশীবাণী দ্বারা তোমাকে অবহিত করছি। যখন (ইউসুফের ভাইগণ) তাদের কাজের ব্যাপারে মতৈক্যে পৌঁছেছিল এবং চক্রান্ত করেছিল তখন তুমি তাদের সাথে ছিলে না।"
হযরত ইউসুফ (আ:) এর কাহিনী পুরোপুরি বর্ণনা করার পর আলোচ্য আয়াতে নবী করিম (সা:) কে সম্বোধন করে বলা হয়েছে, যে কাহিনী বলা হলো তা ঐ সব সংবাদের মত যা আমি ওহীর মাধ্যমে আপনাকে অবহিত করেছি। আপনি ইউসুফের সময়কালে সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। অথবা কোন গল্পের বই থেকেও আপনি তা বর্ণনা করেন নি। কারণ আপনি যে উম্মি তা সকলেরই জানা আছে। কাজেই আপনি যা বলেছেন তা ঐশী জ্ঞান থেকেই বলেছেন। এতে আপনার নব্যুয়তের সত্যতাই প্রমাণিত হয়।
আল্লাহ তালার কাছে অতীত বর্তমান ভবিষ্যত বলতে কিছু নেই, তিনি সব বিষয়েই জ্ঞান রাখেন । কোন কিছুই তার অজানা নয়। নবী রসূলগণকে আল্লাহ তালাই অদৃশ্য সম্পর্কে জ্ঞান দান করেন। নবী রসূলদের অলৌকিক কর্ম এবং যাদুকরের যাদু এক নয়।
এবার ১০৩ ও ১০৪ নং আয়াত নিয়ে আলোচনা করা যাক।
অর্থাৎ "(হে রসূল) আপনি যতই চান, অধিকাংশ মানুষ ইমান আনবে না। আপনি (নব্যুয়তের দায়িত্ব পালনের জন্য ) তাদের কাছ থেকে তো কোন বিনিময় চান না। এ কোরআন তো বিশ্বজগতের জন্য উপদেশ ব্যতীত আর কিছুই নয়।"
হযরত ইউসুফ (আ:) এর কাহিনী বর্ণনার পর এখন ইসলামের প্রতি নবী করিম (সা:) এর আহ্বানের ব্যাপারে মানুষের প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে বলা হচ্ছে , আল্লাহ বলছেন, হে নবী! মানুষকে সত্যের দাওয়াত দিতে গিয়ে আপনি তো তাদের কাছ থেকে কোন পারিশ্রমিক দাবী করছেন না। বরং তারা যাতে আল্লাহর উপর বিশ্বাস স্থাপন করে সেজন্য আপনি চেষ্টা করছেন এবং কষ্ট করছেন। তবে আপনি এটা জেনে রাখুন, অনেক মানুষই আছে যারা বিশ্বাস করবে না সত্য গ্রহণ করতে আগ্রহ দেখাবে না। এমন কি আপনি অনেককেই পাবেন যারা আপনার কথা সত্য মনে করলেও তা গ্রহণ করবে না।
আল্লাহর দ্বীন প্রচারের জন্য নবী রসূলদেরকে অনেক পরিশ্রম করতে হয়েছে। কিন্তু দেখা গেছে অধিকাংশ মানুষ তাদের আহ্বানে সাড়া দেয় নি । এজন্য নবী রাসূলরা দায়ী নন, মানুষকে আল্লাহ তা'লা জ্ঞান ও বিচার বুদ্ধি দিয়েছেন, কাজেই কোন কিছু গ্রহণ ও বর্জন করার স্বধীনতা তাদের রয়েছে।
এবার দেখা যাক ১০৫ নং আয়াতে কি বলা হয়েছে, অর্থাৎ "আকাশ ও পৃথিবীতে অনেক নিদর্শন রয়েছে যার উপর দিয়ে তারা পথ অতিক্রম করে অথচ এসবের প্রতি তারা উদাসীন।"
আগের আয়াতে বলা হয়েছে, সত্য প্রতিভাত হলেও বহু মানুষ তা গ্রহণ করবে না। এই আয়াতে নবী করিম (সা:)কে সান্তনা দিয়ে বলা হচ্ছে , তারা প্রতিনিয়ত আল্লাহর নিদর্শন প্রত্যক্ষ করে যাচ্ছে অথচ আল্লাহর অস্তিত্ব তাদের বোধগম্য হয় না। কাজেই তারা যদি আপনার আহ্বান প্র্রত্যাখ্যান করে তাহলে আপনি দুঃখিত হবেন না। আপনার আহ্বান তো বিশ্ববাসীর কল্যাণের উদ্দেশ্যে, এর পেছনে পার্থিব কোন স্বার্থ নেই। আপনার চিন্তিত বা উদ্বিগ্ন হওয়ারও কোন কারণ নেই।
আকাশ ও পৃথিবীর সকল সৃষ্টিই মহান আল্লাহর অসীম শক্তি ও কুদরতের নিদর্শন বহন করছে। যারা এ ব্যাপারে উদাসীন তারাই সত্যকে গ্রহণ করার সৌভাগ্য লাভ করতে ব্যর্থ হয়।
এবার ১০৬ নং আয়াত, দেখা যাক এতে কি বলা হয়েছে, অর্থাৎ "অনেক মানুষ আল্লাহর উপর বিশ্বাস স্থাপন করে না, আবার তারা যেন শিরকও করে। এই আয়াতে বলা হচ্ছে , অধিকাংশ মানুষ যেমন আল্লাহকেই বিশ্বাস করে না, আবার যারা বিশ্বাস করে তাদের অনেকেরই বিশ্বাস আবার খাঁটি নয়। তারা খাঁটি একত্ববাদী নয়। তারা আল্লাহর পাশাপাশি অন্যের উপরও নির্ভর করে, আল্লাহর সাথে অংশী স্থাপন করে। আল্লাহর এবাদত করে ঠিকই কিন্তু জীবণে আল্লাহর বিধান পুরোপুরি বাস্তবায়ন করে না।"
ইমাম সাদেক (আ) এ সম্পর্কে বলেছেন , এখানে শেরক বলতে মূর্তি পুজাকে বুঝানো হয় নি , আল্লাহ ছাড়া অন্যের উপর নির্ভর করাকে বুঝানো হয়েছে।#
সূরা ইউসুফ : পর্ব-৩০
পাঠক! আজকের আসরে সূরা ইউসুফের ১০৭ থেকে ১০৯ আয়াতের উপর আলোচনা করা হবে।
১০৭ নং আয়াতে বলা হয়েছে," (যারা বিশ্বাস স্থাপন করে না) তারা কি আল্লাহর সর্বগ্রাসী শাস্তি থেকে নিরাপদ হয়ে গেছে ? অথবা তাদের কাছে হঠাৎ কেয়ামত এসে যাবে যে তারা টেরও পাবে না !"
আগের আয়াতে রাসুলে পাক (সা)কে সান্ত্বনা দেয়ার জন্য বলা হয়েছে, তারা যদি আপনার কথার উপর বিশ্বাস স্থাপন না করে তাহলে আপনি মনক্ষুন্ন হবেন না, কারণ তারা বিশ্বজগতের স্রষ্টা মহান আল্লাহকেও বিশ্বাস করে না। এছাড়া তাদের মধ্যে যারা বাহ্যত ঈমান এনেছে বা বিশ্বাস স্থাপন করেছে তাদের সবার ঈমান আবার পূর্ণ নয়, কারণ তাদের অধিকাংশই শেরক্ বা আল্লাহর সাথে অংশীস্থাপনের মত বড় পাপের সাথে সংশ্লিষ্ট হয়ে আছে। কাজেই প্রকৃত ঈমানদার কমই পাওয়া যায়। ১০৭ নং আয়াতে বলা হচ্ছে, যারা প্রতিফল দিবস বা কেয়ামতের দিনের উপর বিশ্বাস রাখে না তাদেরকে আপনি হুশিয়ার করে দিন যে , ইহকালে যদি পাপের জন্য কারো শাস্তি না হয় বা কেউ যদি অকষ্মাৎ মৃত্যুবরণ করে তাহলে সে পার পেয়ে যাবে এমন নয়। কেয়ামতের দিন তাদেরকে পাপের বোঝা মাথায় নিয়ে উপস্থিত হতে হবে, এবং জাহান্নামের শাস্তি সেদিন তাদেরকে গ্রাস করবে।কাজেই কেয়ামতের শাস্তির কথা সবারই মনে রাখা উচিত, এ জীবনই শেষ নয়, মানুষকে তার প্রতিটি কাজের জন্য হিসেব দিতে হবে । প্রত্যেকেই তাদের ভালো কাজের সুফল পাবে আবার পাপের জন্য উপযুক্ত শাস্তিও ভোগ করবে।
এবার ১০৮ নং আয়াতের অর্থ জানা যাক। এতে বলা হয়েছে, " (হে রাসুল) বলে দিন, এটাই আমার পথ, আমি এবং আমার অনুসারীরা মানুষকে আল্লাহর পথে আহ্বান করি সজ্ঞানে। আল্লাহ পবিত্র । আমি অংশীবাদীদের অন্তর্ভুক্ত নই।"
এই আয়াতে মূলত মানুষকে সত্যের দিকে আহ্বানের পদ্ধতি শিক্ষা দেয়া হয়েছে। এখানে বলা হয়েছে ঈমান বা বিশ্বাস হতে হবে জ্ঞাননির্ভর। প্রথমে আল্লাহকে চিনতে হবে, বুদ্ধিবৃত্তির মাধ্যমে , জ্ঞান ও বিবেকের সাহায্যে আল্লাহর অস্তিত্ব আবিস্কার করতে হবে । এরপর আসবে ঈমান বা বিশ্বস স্থাপনের পালা। ইসলাম প্রচারের ক্ষেত্রে নবী করিম (সা) এর এটাই ছিল পদ্ধতি , এ জন্য দেখা যায় যারা রাসুল (সা) এর হাতে ইসলাম গ্রহণের সৌভাগ্য অর্জন করেছেন তাদের সবাই ধর্মের পথে জীবণ উৎসর্গ করতে কখনো দ্বিধা করেননি। বিশ্বাসের শিথিলতা কিংবা শির্ক ঈমানী দুর্বলতার অন্যতম কারণ। দুঃখজনক হলও সত্য যে বহু মানুষের ঈমান শির্কের দ্বারা আক্রান্ত। এজন্য ইসলাম প্রচারের দায়িত্বে যারা নিয়োজিত তাদের কর্তব্য হচ্ছে মানুষের জ্ঞান ও বুদ্ধিবৃত্তিক উৎকর্ষতার জন্য কাজ করা এবং প্রথমে নিজেকে শির্ক থেকে মুক্ত করে অন্যকে এব্যাপারে সতর্ক করা।
এবার ১০৯ নং আয়াত নিয়ে আলোচনা করবো। এ আয়াতে বলা হয়েছে, "(হে রাসুল) তোমার পূর্বে জনপদবাসীদের অনেককে প্রত্যাদেশবাণীসহ প্রেরণ করেছিলাম , অবিশ্বাসীরা কি পৃথিবীতে ভ্রমণ করেনি এবং তাদের পূর্ববর্তীদের কি পরিণাম হয়েছিল তা কি দেখেনি ? যারা সাবধানী তাদের জন্য পরলোকই শ্রেয়, তোমরা বোঝ না ?
অবিশ্বাসীরা রাসুল (সা) এর ব্যাপারে যে সব আপত্তি উত্থাপন করত তার মধ্যে অন্যতম একটি ছিল যে , আল্লাহ যদি রাসুলই পাঠাবেন তাহলে কোন মানুষকে কেন রাসুল হিসেবে পাঠাতে যাবেন ? রাসুল হিসেবে তিনি কাউকে মনোনীত করলে ফেরেশতাদের মধ্য থেকেই তিনি তা করবেন। এই আয়াতে কাফেরদের এই ভ্রান্ত মানসিকতার জবাবে বলা হয়েছে, তারা কি তাদের পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে শুনেনি বা পড়েনি যে অতীতের সকল পয়গম্বরই ছিলেন মানুষ। আকাশ থেকে কোন ফেরেশতা রাসুল বা নবী হিসাবে কখনও আসে নি। হে রাসুল ! তারা যা বলছে নেহায়েত গোয়ার্তুমীর কারণেই তা বলছে, আসলে আকাশ থেকে ফেরেশতা নেমে আসলেও তারা আপনার কথা বিশ্বাস করবে না ।
আয়াতটি শেষ ভাগে পাপাচারী এবং সৎকর্মশীলদের পরিণতির ব্যাপারে ইঙ্গিত করা হয়েছে। বলা হয়েছে, ঈমানদার ব্যক্তিরা এই পৃথিবীতে কষ্ট ও সমস্যার মধ্যে জীবণ যাপন করলেও পরকালে আল্লাহ পাক তাদেরকে তা পুষিয়ে দিবেন। কিন্তু পাপাচারীরা ইহজগতে যেমন শাস্তি ও লাঞ্চনার শিকার হয় পরকালেও তারা কঠোর শাস্তির মুখোমুখি হবে। #
সূরা ইউসুফ : পর্ব-৩১
পাঠক! আজকের আসরে এই সূরার ১১০ ও ১১১ আয়াতের অর্থসহ সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা উপস্থাপন করা হবে। ১১০ নং আয়াতে বলা হয়েছে, " (সত্য ধর্ম প্রচারের কাজ অব্যাহত ছিল) এক পর্যায়ে রাসূলগণ যখন (মানুষের হেদায়েতের ব্যাপারে) নিরাশ হলেন এবং মানুষ ভাবল যে, (শাস্তির ব্যাপারে) রাসূলগণকে মিথ্যা আশ্বাস দেয়া হয়েছে। তখন তাদের নিকট আমার সাহায্য এল। এভাবে আমি যাকে ইচ্ছা করি সে উদ্ধার পায়। অপরাধী সম্প্রদায়ের উপর থেকে আমার শাস্তি রদ করা হয় না।
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন মানব জাতিকে সঠিক পথ প্রদর্শনের উদ্দেশে তাদের মধ্য থেকে একজনকে তাঁর বার্তাবাহক নবী বা রাসূল হিসেবে যুগে যুগে প্রেরণ করেছেন । কিন্তু দেখা গেছে বহু মানুষ তাদের আহ্বানে সাড়া দেয়নি, এমন কি নবী রাসূলদেরকে মিথ্যাবাদী সাব্যস্ত করার চেষ্টা করেছে ।
এই আয়াতে বলা হচ্ছে , মানুষের প্রতিক্রিয়া যাই হোক না কেন নবী রাসূলরা সত্য প্রচারের কাজে অনড় ও অবিচল ছিলেন, তারা কখনোই তাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব পালনের ব্যাপারে কুণ্ঠাবোধ করতেন না ।
অবিশ্বাসী কাফেররা নবী রাসূলদেরকে বিদ্রুপ করে বলতো, যদি তাদের কথা সত্যিই হতো তাহলে এতদিনে ঐশী শাস্তি নেমে আসতো, আর আমরা সেই শাস্তিতে পুরোপুরি নাস্তানাবুদ হয়ে যেতাম।
যখনই অবিশ্বাসীদের ঔদ্ধত্য এতদূর গড়াতো তখনই পয়গম্বর ও তার অনুসারীদের জন্য ঐশী সাহায্য নেমে আসত আর অবিশ্বাসীরা ঐশী শাস্তিতে বিপর্যস্ত হত।
যেমন- হযরত নূহ (আ) একটানা বহু বছর সত্যের বাণী প্রচার করলেন, কিন্তু দেখা গেল খুব নগণ্য সংখ্যক মানুষ তার ডাকে সাড়া দিয়ে সত্য ধর্ম গ্রহণ করেছিল। ফলে এক সময় ঐশী শাস্তি নেমে আসল , মহা প্লাবণ তাদেরকে গ্রাস করেছিল, পরিণতিতে মুষ্টিমেয় বিশ্বাসী ছাড়া সবাই ধ্বংস প্রাপ্ত হয়েছিল।
পাপের শাস্তি শুধু পরকালের জন্যই নির্ধারিত- এমন নয়, ইহজগতেও পাপের শাস্তি ভোগ করতে হতে পারে । এই আয়াত থেকে আমরা আরেকটি বিষয় আমরা বুঝতে পারি , তা হচ্ছে আল্লাহ তা'লা অনেক সময় পাপাচারী কিংবা কোন অবিশ্বাসী কাফেরকে অনুশোচিত হয়ে সত্যের দিকে ফিরে আসার সুযোগ দিয়ে থাকেন । এক্ষেত্রে ইহকালে ঐশী শাস্তি কিছু সময় বিলম্বিত হয় ।
এবার ১১১ নং আয়াতের দিকে যাচ্ছি । এই আয়াতে বলা হয়েছে , "পূর্ব পুরুষদের কাহিনীতে বোধশক্তিসম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্য শিক্ষা রয়েছে। কোরআনের বাণী মিথ্যা রচনা নয়। বরং তা বিশ্বাসী সম্প্রদায়ের জন্য পূর্ববর্তী ধর্মগ্রন্থগুলোর সমর্থক, সমস্ত কিছুর বিশদ বিবরণ, পথ নির্দেশ ও দয়া।"
সূরা ইউসুফের শেষ ভাগে এসে এই আয়াতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে, বলা হয়েছে পবিত্র কোরআনে হযরত ইউসুফ (আ) এর ঘটনা উল্লেখ করার উদ্দেশ্য শ্রেফ কোন ঘটনা বর্ণনা করা নয় , বরং এর মধ্যে মানব জাতির জন্য অনেক কিছু শিখবার রয়েছে। কোরআন কোন ইতিহাস বা কাহিনী সম্ভার নয় । এই মহাগ্রন্থে বর্ণিত প্রত্যেকটি কাহিনীতে জ্ঞানি মানুষের জন্য অনেক কিছু শিখবার ও জানবার বিষয় রয়েছে যদিও অনেকেই এর গভীরতা উপলব্ধি করতে পারে না ।
এছাড়া কোরআন গভীরভাবে অধ্যয়ন করলে যে কোন জ্ঞানি ব্যক্তির বোধগম্য হবে যে এটি মানব রচিত কোন গ্রন্থ নয়। বরং তা ঐশী গ্রন্থগুলোরই ধারাবাহিকতা। এতে মানব জীবণের যাবতীয় সমস্যার সমাধান দেয়া হয়েছে। #